ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাত রাজ্য, যা সেভেন সিস্টার্স নামে পরিচিত, সেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছে নয়াদিল্লি। এ জন্য বাংলাদেশের পার্বতীপুর দিয়ে ৭৬৫ কেভির একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। প্রস্তাবিত করিডরটির দৈর্ঘ্য হবে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার।
তবে ভারতের এ প্রস্তাবে সরাসরি সম্মতি দেওয়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে ঢাকা। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সমান সুযোগ এবং আঞ্চলিক বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থার নিশ্চয়তা ছাড়া ভারতকে এককভাবে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হবে না। বিদ্যুৎ বিভাগের উচ্চপর্যায়ের সূত্র যুগান্তরকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
মুম্বাইয়ের বৈঠকে ভারতের করিডর প্রস্তাব
গত ৯ ও ১০ অক্টোবর ভারতের মুম্বাইয়ে বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বব্যাংকের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই সম্মেলনে বাংলাদেশ, ভারত, মালদ্বীপ, শ্রীলংকাসহ বিভিন্ন দেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন।
বৈঠকে ভারতের পক্ষ থেকে সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহারের প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী, পার্বতীপুর দিয়ে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ ৭৬৫ কেভির একটি হাইভোল্টেজ সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করতে চায় দেশটি।
ভারতের যুক্তি, এই করিডর দিয়ে তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশেরও এ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ আমদানির সুযোগ থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
তবে শুধু বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ঢাকার আপত্তি রয়েছে। বাংলাদেশের অবস্থান, এ ধরনের উদ্যোগে দুই দেশের পাশাপাশি পুরো অঞ্চলের জন্য সমান সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
একক করিডর নয়, আঞ্চলিক গ্রিড চায় বাংলাদেশ
মুম্বাইয়ের বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশের একজন নীতিনির্ধারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে যুগান্তরকে বলেন, ভারতকে প্রস্তাবিত করিডরের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। সমান সুযোগ নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অনুমোদন দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়েছে।
ওই নীতিনির্ধারকের ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে সরাসরি বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগ স্থাপনে আগ্রহী। এ ক্ষেত্রে শুধু একটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সংযোগের পরিবর্তে আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত গ্রিড ব্যবস্থা ভারত-ভুটান-বাংলাদেশ কিংবা নেপাল-ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এমন একটি বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা চায়, যার মাধ্যমে একাধিক দেশ যুক্ত থাকবে এবং প্রত্যেক দেশ প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা নিতে পারবে।
বাংলাদেশের এই অবস্থানের মূল বিষয় হলো, নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে অন্য দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সুযোগ দিলে তার বিনিময়ে দেশেরও সমান ও কার্যকর সুবিধা থাকতে হবে। পাশাপাশি আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
আগেও ভারতের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের ঠিক আগে দুই দেশের বিদ্যুৎ সচিব পর্যায়ের জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজি) বৈঠকে ভারতের করিডর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
গত ১৯ ও ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে প্রস্তাবটি নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয় বলে জানা গেছে। সে সময় সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে ২০২৫ সালে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজ শুরু করে ২০২৮ সালের মধ্যে শেষ করার তাগিদ ছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রস্তাবটির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়নি। ফলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ভারতীয় হাইকমিশনারও তুলেছিলেন ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইনের বিষয়টি
বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীও বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। গত ৬ আগস্ট ঢাকায় তিনি বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সাক্ষাতের সময় ভারতীয় হাইকমিশনার ৭৬৫ কেভি গ্রিড লাইন নির্মাণের বিষয়টি উত্থাপন করেন। অর্থাৎ বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের প্রস্তাবটি শুধু মুম্বাইয়ের সম্মেলনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যেও এ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সাক্ষাতের পর বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ যুগান্তরকে বলেন, ভারত যেভাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে গ্রিড লাইন নিয়ে যেতে চাচ্ছে, বাংলাদেশ সেভাবে বিষয়টি বিবেচনা করছে না।
মন্ত্রীর বক্তব্যে বাংলাদেশের অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। ঢাকা শুধু একটি দেশের বিদ্যুৎ সঞ্চালনের সুবিধা নিশ্চিত করার পরিবর্তে আঞ্চলিক পর্যায়ে সমন্বিত গ্রিড ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
আঞ্চলিক বিদ্যুৎ সহযোগিতায় বাংলাদেশের স্বার্থ
বাংলাদেশের অবস্থান অনুযায়ী, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বিদ্যুৎ সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হলে আঞ্চলিক বিদ্যুৎ বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। প্রস্তাবিত আঞ্চলিক গ্রিডের মাধ্যমে একাধিক দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারত যদি বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সেভেন সিস্টার্সে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে চায়, তাহলে সেই ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও সুবিধার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করছে ঢাকা।
এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভারত পার্বতীপুর দিয়ে ৭৬৫ কেভির সঞ্চালন লাইন নির্মাণের অনুমতি চেয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সমান সুযোগ এবং আঞ্চলিক গ্রিড ব্যবস্থার নিশ্চয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা অনুমোদনের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।









