GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / জাতীয় / ভাড়া বাসা থেকে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম, কে এই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ডেভিড?

ভাড়া বাসা থেকে মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম, কে এই ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ডেভিড?

একসময় ছোট ঠিকাদার হিসেবে কাজ করতেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আজিজুল আকিল ডেভিড। ভাড়া বাসায় জীবন চালাতে হিমশিম খেতে হতো তাঁকে। তবে রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঢাকা ওয়াসার একটি প্রভাবশালী চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার মাধ্যমে তাঁর ব্যবসায়িক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে। বর্তমানে গুলশানে ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে বসবাস এবং রাজধানীর অভিজাত এলাকায় নিজস্ব অফিস থাকার তথ্যও সামনে এসেছে। পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পে ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকার অনিয়ম ও ক্ষতির অভিযোগের ঘটনায় তাঁর নাম উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রকল্পে চীনা ঠিকাদারের বাংলাদেশি প্রতিনিধি ও পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ডেভিড অনিয়মের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানা, ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান এবং প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলামের নামও এ অভিযোগের সঙ্গে এসেছে।

অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের যোগসাজশে কারিগরি আপত্তি উপেক্ষা করে নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার এবং ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফল বা আদালতের রায় প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে কী ঘটেছিল?
ঢাকার ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে পদ্মা নদীর পানি শোধন করে রাজধানীতে সরবরাহের উদ্দেশ্যে মুন্সীগঞ্জের যশলদিয়ায় পানি শোধনাগার প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল পদ্মার পানি পরিশোধন করে ঢাকায় সরবরাহের মাধ্যমে নগরীর পানির চাহিদা পূরণে সহায়তা করা।

কিন্তু প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থা প্রত্যাশা অনুযায়ী কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে চালু করার সময় পাইপ ফেটে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এরপরও চীনা ঠিকাদার চূড়ান্ত বিল ও জামানতের অর্থ তুলে নিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকা ওয়াসার প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে নিম্নমানের পাইপ কেনা, নির্মাণকাজ বুঝে নেওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি সরবরাহ নিশ্চিত না করেই ঠিকাদারকে বিল দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্প থেকে প্রতিদিন ৪৫ কোটি লিটার পানি সরবরাহের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ২৫ কোটি লিটার। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় দৈনিক ২০ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানির ঘাটতিজনিত ক্ষতি এবং পাইপ কেনায় অনিয়ম মিলিয়ে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৬২ কোটি টাকা।
তাকসিম-রফিকুল-ডেভিডের যোগসাজশের অভিযোগ
প্রকল্পের অনিয়মের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার সাবেক এমডি তাকসিম এ খান, প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং ডেভিডের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাঁদের অভিযোগ, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্মাণকাজের মান ও কারিগরি শর্তের বিষয়ে আপস করা হয়েছিল। নিম্নমানের পাইপ ব্যবহার এবং বিভিন্ন কারিগরি আপত্তি উপেক্ষা করে চীনা ঠিকাদারকে সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রকল্পে অনিয়মের বিষয়ে বিগত সরকার এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও তদন্তের দাবি উঠেছিল। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই অভ্যুত্থানের পর তাকসিম এ খান দেশ ছেড়ে পলাতক রয়েছেন। অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম পদে বহাল থাকার পর সম্প্রতি অবসরে গেছেন।

সূত্রের অভিযোগ, অর্থের বিনিময়ে পদে টিকে থাকা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত বন্ধ রাখার ক্ষেত্রে রফিকুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর পরিবারের সদস্যদের ভারতের মুর্শিদাবাদে অবস্থান এবং সেখানে দুর্নীতির অর্থ বিনিয়োগের অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
ছোট ঠিকাদার থেকে বড় ব্যবসায়ী ডেভিড
আজিজুল আকিল ডেভিড বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি বুয়েটে পড়াশোনা শেষ করতে পারেননি। তবে নিজেকে প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ ও বুয়েট অ্যালামনাই হিসেবে পরিচয় দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

একসময় ছোট ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। সংশ্লিষ্ট মহলে তাঁর পরিচিতি ছিল ‘দুই টাকার ঠিকাদার’ হিসেবে। পরে তাকসিম এ খানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি চক্রের সহায়তায় তাঁর ব্যবসায়িক পরিসর বড় হয় বলে দাবি করেছেন সূত্রগুলো।

বর্তমানে ডেভিড গুলশানে একটি ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাটে বসবাস করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজধানীর ১১৭ কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউয়ের ইউনিক হাইটসে তাঁর প্রতিষ্ঠানের প্রায় চার হাজার বর্গফুটের নিজস্ব অফিস রয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ওয়াসার বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের সুযোগ পাওয়ার মাধ্যমে ডেভিডের ব্যবসায়িক উত্থান ঘটে। বিশেষ করে পদ্মা পানি শোধনাগার প্রকল্পে চীনা ঠিকাদারের বাংলাদেশি প্রতিনিধি ও পরামর্শক হিসেবে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোমের অভিযোগ
ডেভিডের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি তাঁর বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগও সামনে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাকসিম এ খান, রফিকুল ইসলাম ও ডেভিডের মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম রয়েছে। দুর্নীতির অর্থ সেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।

এ ছাড়া শেখ রেহানার বিরুদ্ধে লন্ডনে অর্থ পাচারের তথ্য পাওয়ার কথাও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিদেশে সম্পদ থাকা কিংবা অর্থ পাচারের এসব অভিযোগের পক্ষে বিস্তারিত নথি বা তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।

আরও অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের সময়েও বিভিন্ন ব্যক্তিকে অর্থ দিয়ে ডেভিড ব্যবসায়িক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত এই ব্যবসায়ী এখন বিএনপির ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রীর সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক
প্রতিবেদনে ডেভিডের সঙ্গে প্রকল্প পরিচালক মো. রফিকুল ইসলামের স্ত্রীর ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়টিও উঠে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, রফিকুল ইসলামের স্ত্রী এবং ডেভিড ন্যাশনাল ডিজাইন অ্যান্ড কনসালট্যান্ট লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রতিষ্ঠানটিতে বুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক নেতা এবং নৌকা প্রতীকের সাবেক সংসদ সদস্য প্রকৌশলী মো. আব্দুস সবুরসহ আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন প্রকৌশলীও ছিলেন।

প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ প্রকল্প-২-এর ল্যান্ড ফিলিংসহ বিভিন্ন কাজ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, ডেভিডকে চীনা ঠিকাদারের পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রকল্প পরিচালক রফিকুল ইসলাম চাপ দিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, এই ব্যবসায়িক সম্পর্কের কারণে প্রকল্পের বিভিন্ন সিদ্ধান্তে ডেভিডের প্রভাব তৈরি হয়েছিল।
অভিযোগের বিষয়ে যা বললেন ডেভিড
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে যুগান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন আজিজুল আকিল ডেভিড।

তিনি বলেন, ‘সরকার এ বিষয়ে তদন্ত করছে, করুক। তদন্তে যে বা যারা দোষী সাব্যস্ত হবে, তাদের শাস্তি হোক। এটা নিয়ে আপনার কাছে ব্যাখ্যা দিতে হবে কেন?’

এরপর তিনি এ বিষয়ে আর কোনো কথা বলতে চাননি।
বিশেষজ্ঞের বক্তব্য: দায়ীদের শাস্তি ও সেবার নিশ্চয়তা প্রয়োজন
নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ঢাকা ওয়াসার কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ঠিকাদার এবং সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের অসাধু চক্র শত শত কোটি টাকার দুর্নীতি করেছে।

তাঁর অভিযোগ, গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়নি। বর্তমান সরকারের সময়েও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে এখনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা এগিয়ে থাকছেন। এটিকে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সেবা চালুর ওপর গুরুত্ব দেন।

অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খানের মতে, প্রকল্প থেকে প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়া গেলেও বিদেশি ঋণের কিস্তি সরকারকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের অনিয়মের দায় নির্ধারণ এবং জনগণের জন্য কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন দুদকে
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, বিগত সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে।

তিনি জানান, পদ্মা প্রকল্পের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। কমিটির প্রতিবেদন দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুদক বিস্তারিত তদন্ত করলে প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়গুলো সামনে আসবে। তদন্তে যারা দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার কোনো দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেবে না।
তদন্তের ফলের অপেক্ষা
পদ্মা (যশলদিয়া) পানি শোধনাগার প্রকল্পের বাস্তবায়ন, পাইপের মান, ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ এবং প্রত্যাশিত পানি সরবরাহ না পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে একাধিক অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সঙ্গে ঢাকা ওয়াসার সাবেক কর্মকর্তা, প্রকল্প পরিচালক এবং চীনা ঠিকাদারের বাংলাদেশি প্রতিনিধির নাম এসেছে।

তবে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের পর্যালোচনা গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যে দুদকে পাঠানো হয়েছে। এখন তদন্তে কারা দায়ী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

Social Icons