ময়মনসিংহের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছরে লাখের বেশি শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার চিত্রটা প্রবাসী পরিবারগুলোর কাছেও সতর্কতা হয়ে আসছে। কারণ, ঝরে পড়া বাড়লে শুধু একটি জেলার শিক্ষার মান কমে না—ভবিষ্যৎ সুযোগও সরে যায় শিশুদের হাত থেকে।
এক বছরের বড় ধাক্কা

প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহে ২০২৫ সালে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৫ লাখ ৩৮ হাজারের বেশি। ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৪ লাখ ২৫ হাজারের মতো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এক লাখের বেশি শিশুর বিদ্যালয় থেকে বিদায় নেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
শুধু পরিসংখ্যান নয়, শ্রমবাজারের টান
দারিদ্র্যের চাপ অনেক শিশুকে শ্রমবাজারে ঠেলে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কেউ কাজ শিখতে ঢাকায় যাচ্ছে, কেউ পরিবারের আয় বাড়াতে সহায়তা করছে। ফলে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়ার বেদনাদায়ক বাস্তবতা দেখা দিচ্ছে।
আবার কিছু শিশুর ক্ষেত্রে বিকল্প পথে যাত্রার কথাও বলা হয়েছে—কওমি মাদ্রাসা কিংবা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার প্রবণতা আছে। তবে প্রশ্নটা একটাই থাকে: যে বয়সে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা নিশ্চিত হওয়া উচিত, সেই সময়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে কেন?
ঝরে পড়া বাড়ছে, কিছু এলাকায় হার বেশি
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে ঝরে পড়ার হার আবার বাড়ছে। কিছু অঞ্চলে তা ৩০ শতাংশের বেশি পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে। এই চিত্রকে বিচ্ছিন্ন ধরে নেওয়া যাচ্ছে না—দরিদ্রতার সঙ্গে ঝরে পড়া যে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত, সেটাই ইঙ্গিত দেয়।
বিদ্যালয় বাস্তবতাও সংকট বাড়াচ্ছে
দারিদ্র্যের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতাও ভূমিকা রাখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে। ময়মনসিংহে অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই, কোথাও শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতাও আছে। এসব কারণে একাধিক শ্রেণির পাঠ একসঙ্গে চলতে পারে, আবার সময়ের আগেই ছুটি দিতে হতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যালয়ের প্রতি আগ্রহ কমতে থাকে।
প্রবাসী পরিবার ভাববে—আগে থেকেই প্রতিরোধ দরকার
বাংলাদেশে থাকা আত্মীয়স্বজন বা দেশে ফেরার পরিকল্পনায় থাকা পরিবারগুলোর জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রাথমিক শিক্ষায় টান পড়লে ভবিষ্যৎ শিক্ষা ও ভালো কাজের সম্ভাবনা পিছিয়ে যায়। তাই ঝরে পড়া রোধে এখনই কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। প্রতিবেদনে যে দিকগুলো জোর দিয়ে বলা হয়েছে—শর্তসাপেক্ষ নগদ সহায়তা ও উপবৃত্তি সম্প্রসারণ, ‘মিড-ডে মিল’ কর্মসূচি সর্বজনীন করা—এসবের উদ্দেশ্য একটাই: শিশুকে কাজের বদলে বিদ্যালয়ে ধরে রাখা।
এদিকে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নও জরুরি। অভিভাবকদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের যোগাযোগ নিয়মিত জোরদার করাও সহায়ক হতে পারে। শিক্ষা কেবল একটি খাত নয়; জাতির ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে থাকে শিশুদের পড়ার সুযোগের ওপর। এক বছরে এক লাখের বেশি শিক্ষার্থীর কমে যাওয়ার ঘটনা তাই উপেক্ষা করার মতো নয়।
যে প্রশ্নগুলো সামনে আসে
১) কেন এত শিক্ষার্থী কমছে?
দারিদ্র্যের চাপের কারণে অনেক শিশু শ্রমবাজারে যাচ্ছে বা পড়াশোনার ধরন বদলাচ্ছে।
২) বিদ্যালয় পর্যায়ে কী বাধা কাজ করছে?
প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকসংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং একই সময়ে একাধিক শ্রেণির পাঠদানের মতো বাস্তবতা ঝরে পড়াকে বাড়াতে পারে।
৩) সমাধান কোথায় সবচেয়ে বেশি দরকার?
সহায়তা কার্যক্রম, ‘মিড-ডে মিল’, শিক্ষক-ব্যবস্থা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশ—এই চার দিকেই তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ দরকার।
আরও পড়ুন: এই বিভাগের সর্বশেষ খবর
সূত্র: prothomalo.com









