একসময় জলাকীর্ণ জনপদ হিসেবে পরিচিত যশোর শহরে এখন প্রাকৃতিক পানির উৎস সংকটে পড়েছে।
কয়েক দশকে শহরের শতাধিক পুকুর ও কয়েকটি বড় দিঘি ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল আবাসিক ভবন ও বিপণিবিতান। এতে কমেছে প্রাকৃতিক পানির উৎস, নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং বাড়ছে পরিবেশগত নানা ঝুঁকি।
সাড়ে ১৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের যশোর শহরে প্রায় সাড়ে চার লাখ স্থায়ী বাসিন্দা রয়েছে। প্রতিদিন শহরে চলাচল করেন অন্তত ১০ লাখ মানুষ। বিপুল এই জনগোষ্ঠীর চাহিদার বিপরীতে দিন দিন কমছে পুকুর, দিঘি ও অন্যান্য জলাশয়।
২০১৭ সালের স্যাটেলাইট জরিপ অনুযায়ী, যশোর শহরে ৪৪.৫ একরের ২৩২টি ডোবা এবং ২২৮ একরের ৫৭২টি পুকুর ছিল। তবে বর্তমানে এসব জলাশয়ের সংখ্যা অনেক কমে গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের বড় জলাশয় আরবপুর দিঘি ও চোরমারা দিঘি কয়েক বছর আগেই ভরাট করা হয়েছে। সেখানে এখন গড়ে উঠেছে আবাসিক এলাকা ও বহুতল ভবন। জলাশয় ভরাটের কারণে এসব এলাকায় বর্ষাকালে জলাবদ্ধতাও দেখা দিচ্ছে।
শহরের ঐতিহ্যবাহী লালদিঘির একাংশ ভরাট করে পৌর কর্তৃপক্ষ বিপণিবিতান নির্মাণ করেছে। ফলে একসময়ের বড় দিঘিটি এখন অনেকটাই মরা ডোবায় পরিণত হয়েছে। এছাড়া সন্যাসদিঘিসহ শতাধিক পুকুর ভরাট করে গড়ে উঠেছে আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রকাশ্যে পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ হলেও কার্যকর তদারকি নেই। পরিবেশ আইন ও জলাশয় সংরক্ষণ আইন থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পরিবেশকর্মী বিথিকা সরকার বলেন, এক দশকে প্রায় শতাধিক প্রাকৃতিক জলাধার বিলুপ্ত হয়েছে। এসব জায়গায় আবাসিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় পানির সংকট তৈরি হয়েছে। বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনায় প্রাকৃতিক পানির উৎস না থাকায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
যশোর সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ছোলজার রহমান বলেন, জলাশয় ভরাট করে দ্রুত বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। নগর পরিকল্পনা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় যশোর অপরিকল্পিত নগরে পরিণত হচ্ছে।
তবে যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান জানান, জলাশয় ভরাট বন্ধে পৌর কর্তৃপক্ষ পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২২ সাল থেকে পুকুর শ্রেণির কোনো জমিতে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না বলেও তিনি দাবি করেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মো. আতাউর রহমান বলেন, আইন অনুযায়ী জলাধার বা পুকুরকে বাণিজ্যিক বা বসতভিটার জমিতে রূপান্তর করা যায় না। অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত করে পুকুর ভরাটের প্রমাণ মিললে মামলা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।








