নিজেকে রাজশাহী রেঞ্জের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) পরিচয় দিয়ে বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের অভিযোগে অতিরিক্ত ডিআইজি টুটুল চক্রবর্তীকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। অনুমোদিত ছুটির আগেই বিধিবহির্ভূতভাবে কর্মস্থল ত্যাগ এবং অসদাচরণের অভিযোগেও তার বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে তিনি পলাতক রয়েছেন বলে সরকারি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরীর সই করা প্রজ্ঞাপনে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) প্রজ্ঞাপনটি প্রকাশ করা হয়।
অনুমোদিত ছুটির আগেই কর্মস্থল ত্যাগ
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, রাজশাহীতে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় টুটুল চক্রবর্তীকে ২০২৫ সালের ১৪ ও ১৫ নভেম্বর দুই দিনের কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এ ছাড়া ১৬ থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত তিন দিনের নৈমিত্তিক ছুটিও মঞ্জুর ছিল।
তবে অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি ১৩ নভেম্বর পূর্বাহ্নে কোনো প্রস্থান প্রতিবেদন জমা না দিয়েই কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ওই দিন নিজেকে রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি পরিচয় দিয়ে রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহার করেন। পরে সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে ঢাকার উদ্দেশে রাজশাহী ছাড়েন।
প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, এর আগেও একাধিকবার রাজশাহী বিমানবন্দরে একই পরিচয়ে ভিআইপি লাউঞ্জ ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার নজরে আসেন টুটুল চক্রবর্তী। এ ঘটনায় জনসমক্ষে পুলিশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বিভাগীয় তদন্তে অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত
ঘটনার পর টুটুল চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এরপর ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা করা হয়। সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশও দেওয়া হয়েছিল।
তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি লিখিত জবাব দেননি। সময় বাড়ানোর আবেদনও করেননি। পরে অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনায় ২ এপ্রিল তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা ৭ মে প্রতিবেদন জমা দেন। ওই প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে বলে মত দেওয়া হয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, টুটুল চক্রবর্তী ২৩ জানুয়ারি থেকে পলাতক রয়েছেন।
এরপর ১৬ জুন তাকে দ্বিতীয় দফায় কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। কেন তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হবে অথবা অন্য কোনো গুরুদণ্ড দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ নোটিশেরও কোনো জবাব দেননি তিনি।
পিএসসির পরামর্শের পর বরখাস্তের সিদ্ধান্ত
পরবর্তী সময়ে কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরি থেকে বরখাস্তের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়। এ বিষয়ে ২৩ জুলাই বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) পরামর্শ চাওয়া হয়। ১৪ সেপ্টেম্বর পিএসসি তাকে বরখাস্তের গুরুদণ্ড দেওয়া যেতে পারে বলে মত দেয়।
সবশেষে নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্রপতির অনুমোদন নিয়ে ৫ অক্টোবর বরখাস্তের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, অসদাচরণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এবং কর্মস্থল থেকে পলাতক থাকার কারণে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
পুলিশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন
টুটুল চক্রবর্তী ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০০১ সালের ৩১ মে পুলিশে যোগ দেন। কর্মজীবনে তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার এবং ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২২ সালের ৩১ মে তিনি পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি পদে পদোন্নতি পান। তার বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলায়। তিনি ডিএমপির উপকমিশনার (ডিসি) ছাড়াও সিরাজগঞ্জ ও কুমিল্লার পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি বিপিএম পদক পেয়েছিলেন। সর্বশেষ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।








