আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজায় সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে উৎসবের আয়োজন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় এবার মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা নির্মাণ, মণ্ডপ সাজানো এবং নিরাপত্তার প্রস্তুতি চলছে শেষ পর্যায়ে।
পূজাকে সামনে রেখে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রতিমাশিল্পী ও কারিগররা। কোথাও চলছে প্রতিমায় রং করার কাজ, আবার কোথাও মণ্ডপের সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জা সম্পন্ন করা হচ্ছে। অন্যদিকে রাজধানীর বিপণিবিতানগুলোতে পূজার পোশাক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী কেনার ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে।
গত বছরের তুলনায় বেড়েছে মণ্ডপ
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধর জানান, এবার সারা দেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। গত বছর এ সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১টি। অর্থাৎ এক বছরে মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এবারও সারা দেশে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপন করা সম্ভব হবে।
ঘোড়ায় দেবীর আগমন, গমন নৌকায়
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত তপন ভট্টাচার্য জানান, শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী এবার দেবী দুর্গার আগমন হবে ঘোড়ায় এবং গমন হবে নৌকায়।
ধর্মীয় ব্যাখ্যায় দেবীর ঘোড়ায় আগমনকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংঘাতের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অন্যদিকে নৌকায় গমনকে বৃষ্টি, জলবৃদ্ধি ও শস্যের ফলনের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে এগুলো ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় বিশ্বাসভিত্তিক ব্যাখ্যা, বৈজ্ঞানিক আবহাওয়ার পূর্বাভাস নয়।
তপন ভট্টাচার্য আরও জানান, মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হয়। এদিন ভোরে বিভিন্ন মন্দির ও বাড়িতে চণ্ডীপাঠ, পূজা এবং ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। এরপর ষষ্ঠী তিথিতে দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়।
প্রতিবেদনে দেওয়া সূচি অনুযায়ী, ১৫ অক্টোবর দেবীর বোধন এবং ১৬ অক্টোবর ষষ্ঠী তিথির আনুষ্ঠানিকতা হওয়ার কথা। ১৭ ও ১৮ অক্টোবর সপ্তমী, ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসব শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
রাজধানীতে প্রতিমা ও মণ্ডপ তৈরির ব্যস্ততা
রাজধানীর গুলশান-বনানী সার্বজনীন পূজা ফাউন্ডেশনের মণ্ডপে এবার ‘জলজ’ থিমকে কেন্দ্র করে সাজসজ্জা করা হচ্ছে। জল, প্রকৃতি ও জীবনের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরতে বিভিন্ন উপাদান ও কারুশিল্প ব্যবহার করা হচ্ছে।
মণ্ডপটির থিম আর্টিস্ট পার্থ প্রতীম সাহা জানান, পৃথিবীতে জলের উপস্থিতির সঙ্গে প্রাণের অস্তিত্ব গভীরভাবে সম্পর্কিত। এই ভাবনাকে কেন্দ্র করেই মণ্ডপের নকশা তৈরি করা হয়েছে। দেবী দুর্গার সঙ্গে জলের সম্পর্কের বিষয়টিও শিল্পভাবনায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হচ্ছে।
পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারেও প্রতিমাশিল্পীদের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। কেউ প্রতিমায় মাটির শেষ প্রলেপ দিচ্ছেন, কেউ রং ও সাজসজ্জার কাজ করছেন।
প্রতিমাশিল্পী লিটন পাল জানান, এবার দিন-রাত কাজ করে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী প্রতিমা তৈরি করা হচ্ছে। তবে আগের বছরের তুলনায় প্রতিমা তৈরির খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন রমনা কালীমন্দিরেও প্রতিমা নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। কারিগররা প্রতিমাকে নান্দনিক করে তুলতে রং ও অলংকরণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
দুর্গাপূজায় বিশেষ নিরাপত্তার প্রস্তুতি
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। কমিশনার মোসলেহ্ উদ্দীন আহমদ বলেছেন, পূজামণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালন করবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, মহালয়া, দুর্গাপূজা ও প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পূজামণ্ডপ সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। দায়িত্বে থাকা পুলিশের ইনচার্জরা বডি-ওর্ন ক্যামেরাও ব্যবহার করবেন।
নিরাপত্তা কার্যক্রমে পোশাকধারী ও সাদাপোশাকের পুলিশের পাশাপাশি সোয়াট, ক্রাইসিস রেসপন্স টিম, কুইক রেসপন্স টিম এবং বম্ব ডিসপোজাল ইউনিট প্রস্তুত থাকবে বলে জানান ডিএমপি কমিশনার।
পূজা উদযাপন কমিটিগুলোকেও নিজস্ব নিরাপত্তার বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করার পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ।
মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি, প্রতিমা তৈরির শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রস্তুতি মিলিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে এখন শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে চলছে ব্যাপক আয়োজন।









