মালীয় বংশোদ্ভূত বালি বাগায়োকো এখন ফ্রান্সের আলোচিত স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। প্যারিসের উপকণ্ঠে বেড়ে ওঠা এই রাজনীতিক দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় সরকার ও জনসম্পৃক্ত রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ২০২৬ সালের মার্চে পৌর নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি সাঁ দেনি ও পিয়েরফিতের মেয়র হন। সম্প্রতি ফ্রান্সে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে তাঁর অংশগ্রহণের ঘটনাও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাগায়োকোর জীবন ও রাজনৈতিক পথচলার পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী পরিবারের পরিবেশ, পড়াশোনা, খেলাধুলা এবং দীর্ঘদিনের স্থানীয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা। তাঁর গল্প কেবল নির্বাচনে জয়ের নয়; বরং স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে নেতৃত্বে উঠে আসারও একটি উদাহরণ।
মালীয় শিকড়, বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে
বালি বাগায়োকোর জন্ম ১৯৭৩ সালের ৩১ জুলাই ফ্রান্সের ল্যভালোয়া-পেরেতে। তাঁর পরিবারের শিকড় পশ্চিম আফ্রিকার দেশ মালিতে। বাবা অটোমোবাইল খাতের শ্রমিক ছিলেন। শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে প্যারিসের উত্তরের শহর সাঁ দেনিতে, যেখানে তিনি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বেড়ে ওঠেন।
সাঁ দেনির পল এলুয়ার উচ্চবিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি প্যারিস এইট বিশ্ববিদ্যালয়ে উপনগরী ও ভূরাজনীতিসংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেন। পড়াশোনার পাশাপাশি বাস্কেটবলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। আধা-পেশাদার পর্যায়ে খেলেছেন এবং পরে কোচ হিসেবেও কাজ করেছেন।
খেলাধুলার মাধ্যমে স্থানীয় তরুণদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এই অভিজ্ঞতা ভূমিকা রাখে।
চাকরি থেকে রাজনীতির পথে
বাগায়োকোর কর্মজীবনের সঙ্গে যুক্ত ছিল ফ্রান্সের গণপরিবহন সংস্থা আরএটিপি (RATP)। ২০০০ সাল থেকে সেখানে তিনি ব্যবস্থাপনাসংশ্লিষ্ট দায়িত্বে ছিলেন বলে তাঁর সরকারি জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে।
রাজনীতিতে তাঁর যাত্রা শুরু ২০০১ সালে। ওই সময় তিনি সাঁ দেনির স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে উপমেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্থানীয় যুবসমাজ, খেলাধুলা ও কর্মসংস্থানসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকেন।
২০০৮ সালে তিনি সেইন-সাঁ-দেনি অঞ্চলের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হন এবং পরে বিভাগীয় পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। বামপন্থি রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বাগায়োকো পরবর্তী সময়ে লা ফ্রঁস অ্যাঁসুমিস (La France Insoumise—LFI) দলের রাজনীতিতে সক্রিয় হন।
২০২৬ সালের নির্বাচনে মেয়র
২০২৬ সালের ১৫ মার্চ অনুষ্ঠিত ফ্রান্সের পৌর নির্বাচনের প্রথম দফায় বাগায়োকোর নেতৃত্বাধীন তালিকা সাঁ দেনি ও পিয়েরফিতের মেয়র নির্বাচনে ৫০ দশমিক ৭৭ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হয়। এর মধ্য দিয়ে তিনি শহরটির নতুন মেয়র হন।
দীর্ঘদিনের স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পর এই জয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সাঁ দেনির মতো জনবহুল ও সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় শহরে তাঁর নির্বাচনী সাফল্য ফরাসি বামপন্থি রাজনীতিতেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আলোচনায়
২০২৬ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ফ্রান্সের বিভিন্ন এলাকায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা ও শিক্ষার জন্য বরাদ্দ নিয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে বাগায়োকোও শিক্ষার্থীদের একটি বিক্ষোভে অংশ নেন।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্যারিসে বিক্ষোভের সময় তিনি পুলিশ ও তরুণ বিক্ষোভকারীদের মাঝখানে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাসের প্রভাবে তাঁকে সেখান থেকে সরিয়ে নিতে হয়। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁকে ঘিরে আলোচনা আরও বাড়ে।
বাগায়োকো বিক্ষোভকারীদের পাশে দাঁড়ানোর পক্ষে বক্তব্য দেন। তাঁর মতে, অল্পসংখ্যক মানুষের বিশৃঙ্খল আচরণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের যৌক্তিকতা তৈরি করে না। অন্যদিকে, বিক্ষোভের সময় সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনাও ফ্রান্সে বিতর্কের বিষয় হয়ে উঠেছে।
কেন আলোচনায় বাগায়োকো?
বাগায়োকোর পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর দীর্ঘ স্থানীয় রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং সামাজিকভাবে বৈচিত্র্যময় একটি শহরের নেতৃত্বে উঠে আসা। মালীয় বংশোদ্ভূত শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান হিসেবে তাঁর বেড়ে ওঠা, খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় প্রশাসনে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছে।
সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভে তাঁর উপস্থিতি তাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় নিয়ে এসেছে। তবে তাঁকে শুধু একটি ভাইরাল ছবি বা ঘটনার মধ্য দিয়ে মূল্যায়ন করলে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ কার্যক্রমের মূল্যায়নে স্থানীয় প্রশাসনে তাঁর কাজ এবং জনসাধারণের সঙ্গে সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।









