কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অ্যানথ্রপিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উত্তর ইয়েমেনভিত্তিক একটি সাইবার হুমকি সৃষ্টিকারী গোষ্ঠী গোপনে তাদের এআই সিস্টেম ‘ক্লড’ ব্যবহার করে গাইডেড রকেট ও অন্যান্য উন্নত অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করেছে। প্রতিবেদনে সরাসরি হুতিদের নাম উল্লেখ করা হয়নি। তবে উত্তর ইয়েমেন ইরান-সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকায় ঘটনাটি তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অ্যানথ্রপিক ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এআইয়ের অপব্যবহার শনাক্ত ও প্রতিরোধ নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে।
অস্ত্র তৈরিতে এআইয়ের ব্যবহার
অ্যানথ্রপিকের তথ্য অনুযায়ী, ওই গোষ্ঠী ‘ক্লড’ ব্যবহার করে উড়ন্ত যানকে দিকনির্দেশ দেওয়া ও স্থিতিশীল রাখার সফটওয়্যার তৈরির চেষ্টা করেছিল।
তারা মানুষের প্রকৌশলীদের কাজের পাশাপাশি এআই ব্যবহার করে গাইডেন্স, নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত সফটওয়্যার তৈরির কাজে এগিয়ে যায়।
অস্ত্র উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে ‘ক্লড’-এর সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে সফটওয়্যার লেখা, গবেষণা, ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ, সফটওয়্যার উন্নয়ন এবং ফ্লাইট সিমুলেশনের মতো কাজ ছিল।
তিন ধরনের অস্ত্র কর্মসূচি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই গোষ্ঠী অন্তত তিনটি অস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছিল।
এর মধ্যে প্রথমটি ছিল একটি গাইডেড রকেট, যেখানে ফোন-শ্রেণির ফ্লাইট কম্পিউটার এবং শেষ ধাপের হোমিং গাইডেন্স ব্যবহারের পরিকল্পনা ছিল।
দ্বিতীয় কর্মসূচিটি ছিল একটি বহু-স্তরের ব্যালিস্টিক মিসাইল, যার সম্ভাব্য পাল্লা দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তৃতীয়টি ছিল ‘আর২০০০’ নামের একটি মিসাইল কর্মসূচি। এর মধ্যে একটি হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল সংস্করণও অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে।
একসঙ্গে একাধিক এআই সেশন চালানো হতো
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গোষ্ঠীটি একই সময়ে একাধিক ‘ক্লড’ সেশন চালাত। প্রতিটি সেশনে আলাদা কাজ দেওয়া হতো।
একটি এআই সেশন ব্যবহার করা হতো কোডিংয়ের জন্য, আরেকটি গবেষণার কাজে এবং অন্য একটি সেশন দিয়ে প্রথমটির তৈরি কাজ পর্যালোচনা করা হতো।
এভাবে বড় একটি প্রকল্পকে ছোট ছোট কাজে ভাগ করে তারা এআইয়ের সহায়তা নেওয়ার চেষ্টা করেছিল।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গোষ্ঠীটির অনেক অনুরোধ আটকে দিয়েছিল। তবে তারা কিছু নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নেয়।
তাদের উদ্দেশ্য এবং সফটওয়্যারের প্রকৃত ব্যবহার গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। একই সঙ্গে পুরো অস্ত্র কর্মসূচির তথ্য একটি কথোপকথনে না রেখে বিভিন্ন সেশনে ভাগ করে দেওয়া হয়।
এর ফলে এআই সিস্টেমের কাছে প্রকল্পটির সম্পূর্ণ উদ্দেশ্য স্পষ্ট না রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
গাইডেড রকেটের পরীক্ষা ব্যর্থ
অ্যানথ্রপিকের তথ্য অনুযায়ী, ওই গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনে একটি গাইডেড রকেটের সরাসরি পরীক্ষা চালিয়েছিল। পরীক্ষাটি ব্যর্থ হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
পরীক্ষার কয়েক ঘণ্টা পরই তারা আবার ‘ক্লড’-এর কাছে ফিরে যায় এবং কোথায় সমস্যা হয়েছিল তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।
তবে অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, এই গোষ্ঠী সফলভাবে কোনো কার্যকর অস্ত্র মাঠে নামাতে পেরেছে, এমন প্রমাণ তারা পায়নি।
এআই ছাড়াও কাজ চালানোর ব্যবস্থা
শুধু ‘ক্লড’-এর ওপর নির্ভর করেই তারা থেমে থাকেনি। অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, ব্যালিস্টিক মিসাইলের সিমুলেশন এবং অন্যান্য অস্ত্রের কাজেও এআই ব্যবহার করা হয়েছিল।
এর মধ্যে গতিপথ মডেল করা এবং ফ্লাইট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা উন্নত করার মতো কাজ ছিল।
পরে গোষ্ঠীটি এমন একটি অফলাইন সিমুলেশন টুলকিট তৈরি করে, যা ‘ক্লড’ বা ম্যাটল্যাবের মতো প্রকৌশল সফটওয়্যার ছাড়াই কাজ করতে পারে। শেষ পর্যন্ত এটিকে একটি স্বতন্ত্র প্রোগ্রামে রূপান্তর করা হয়।
এর ফলে পরবর্তী সময়ে তারা অ্যানথ্রপিকের এআই সিস্টেম ছাড়াই নিজেদের প্রকৌশল কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
অ্যানথ্রপিকের কঠোর পদক্ষেপ
ঘটনাটি শনাক্ত হওয়ার পর অ্যানথ্রপিক ওই গোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের অংশীদারদের সঙ্গে ভাগ করে নেয়।
কোম্পানিটির মতে, এই ঘটনা দেখিয়েছে যে ব্যবহারকারীরা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের উদ্দেশ্য গোপন করলে এবং একটি জটিল প্রকল্পকে একাধিক আলাপচারিতায় ভাগ করে দিলে এআই-নির্ভর অস্ত্র উন্নয়ন ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।
এআইয়ের অপব্যবহার নিয়ে নতুন উদ্বেগ
এই ঘটনা উন্নত এআই প্রযুক্তির সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে অস্ত্র উন্নয়নের মতো সংবেদনশীল কাজে এআই ব্যবহারের মাধ্যমে গবেষণা, সফটওয়্যার তৈরি ও সিমুলেশনের মতো কাজ দ্রুত করা সম্ভব হওয়ায় নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তবে অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে ওই গোষ্ঠী শেষ পর্যন্ত কার্যকর কোনো অস্ত্র সফলভাবে মাঠে মোতায়েন করতে পেরেছে।









