স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে স্বাধীনতাপন্থী শক্তির প্রভাব বাড়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিন অঞ্চলের নেতারা আরও স্বায়ত্তশাসন, স্বাধীনতার গণভোট এবং নিজেদের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার দাবি করছেন।
দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, স্বায়ত্তশাসিত এই তিন অঞ্চলের নেতারা ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনে মিলিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেখানে তারা যৌথ ঘোষণাপত্রে সই করতে পারেন। ঘোষণাপত্রে স্বাধীনতার গণভোট আয়োজন এবং সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিজেরা নির্ধারণের অধিকারের দাবি থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
একসঙ্গে তিন অঞ্চলে স্বাধীনতাপন্থী শক্তি
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, প্রথমবারের মতো স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড তিন অঞ্চলেই স্বাধীনতাপন্থী দলগুলো ক্ষমতার কেন্দ্রে রয়েছে।
স্কটল্যান্ডে এসএনপি এখনো বড় রাজনৈতিক শক্তি। ওয়েলসে কার্ডিফ সেনেডে প্লেড সিমরু সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইনের নেতৃত্ব অব্যাহত রয়েছে।
এই রাজনৈতিক সমীকরণ যুক্তরাজ্যের কেন্দ্রীয় সরকার, বিশেষ করে ওয়েস্টমিনস্টারের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে।
স্কটল্যান্ডে আবারও গণভোটের আলোচনা
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্কও নতুন করে তীব্র হয়েছে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সম্প্রতি বলেছেন, স্বাধীনতার পক্ষে জনসমর্থনের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে আরেকটি গণভোটের অনুমতি দেওয়া হতে পারে।
এই মন্তব্যকে স্বাধীনতাপন্থীরা বড় রাজনৈতিক সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
এসএনপি নেতা ও স্কটল্যান্ডের প্রথম মন্ত্রী জন সুইনি দাবি করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে পুরোনো রাজনৈতিক কাঠামো আর টেকসই নয়।
তিনি এমনও মন্তব্য করেছেন যে অ্যান্ডি বার্নহাম ইতিহাসে যুক্তরাজ্যের শেষ প্রধানমন্ত্রী হয়ে উঠতে পারেন।
ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন গতি
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনা বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়ারল্যান্ড সফরের সময় একটি সংযুক্ত আয়ারল্যান্ড দেখার ইচ্ছার কথা জানান।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে পুনর্মিলনের সম্ভাবনাকে তিনি ইতিবাচকভাবে দেখেছেন।
ট্রাম্পের এই মন্তব্যের পর জাতীয়তাবাদী দলগুলোর রাজনৈতিক দাবি আরও জোরালো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ওয়েলসেও বদলাচ্ছে রাজনৈতিক সমীকরণ
ওয়েলসে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির দুর্বল ফলাফলের পর রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে গেছে। প্লেড সিমরু সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসায় দলটির নেতা রুন আপ ইওয়ের্থের ওয়েলসের প্রথম মন্ত্রী হওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
ফলে যুক্তরাজ্যের তিনটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের রাজনৈতিক নেতৃত্বেই এখন কেন্দ্রীয় সরকারের তুলনায় বেশি স্বায়ত্তশাসনের দাবি জোরালোভাবে সামনে আসছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে সিন ফেইনের শক্ত অবস্থান
উত্তর আয়ারল্যান্ডে ২০২২ সালের নির্বাচনে সিন ফেইন সবচেয়ে বড় দল হিসেবে উঠে আসে। ২০২৪ সালে মিশেল ও’নিল প্রথম মন্ত্রী হওয়ার পর দলটির প্রভাব আরও দৃঢ় হয়েছে।
আগামী বছর উত্তর আয়ারল্যান্ডে আবার নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। দলটি সেখানে ক্ষমতা ধরে রাখবে বলেই রাজনৈতিকভাবে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে কার্ডিফের সম্মেলনে সিন ফেইনের সভাপতি ও আয়ারল্যান্ডের বিরোধী দলীয় নেতা মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।
‘পুরনো অবস্থা আর টেকসই নয়’
জন সুইনি বলেছেন, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডে স্বাধীনতাপন্থী নেতৃত্বের উপস্থিতি যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তার ভাষায়, গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের গতি এখন অস্বীকার করার উপায় নেই। ওয়েস্টমিনস্টারকে তাই যুক্তরাজ্য-পরবর্তী সম্ভাব্য ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে হবে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাজ্য অবিলম্বে ভেঙে যাচ্ছে। স্বাধীনতার দাবি জোরালো হলেও প্রতিটি অঞ্চলের সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গণভোট, আইনগত প্রক্রিয়া এবং জনসমর্থনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তর আয়ারল্যান্ডে গণভোটের সাংবিধানিক পথ
গুড ফ্রাইডে চুক্তির অধীনে উত্তর আয়ারল্যান্ডের যুক্তরাজ্য থেকে বেরিয়ে আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে পুনর্মিলনের গণভোটের একটি সাংবিধানিক পথ রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, উত্তর আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তরাজ্য ছাড়ার পক্ষে থাকতে পারেন বলে যুক্তিসঙ্গত সম্ভাবনা তৈরি হলে এমন গণভোট আয়োজনের সুযোগ রয়েছে।
ফলে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা, ওয়েলসের স্বায়ত্তশাসন এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডের পুনর্মিলনের দাবি একসঙ্গে জোরালো হলে যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক আরও গভীর হতে পারে।
তিন অঞ্চলের এই রাজনৈতিক ঐক্য এখন যুক্তরাজ্যের জন্য বড় সাংবিধানিক চ্যালেঞ্জ। প্রশ্ন হলো, এটি কি শুধু বাড়তি স্বায়ত্তশাসনের দাবি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি শেষ পর্যন্ত সত্যিই যুক্তরাজ্যের বর্তমান কাঠামো ভেঙে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার জন্ম দেবে?








