জাতীয় পরিচয়পত্রে (NID) নিজের নাম, বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখ, ঠিকানা কিংবা অন্য কোনো তথ্যে ভুল থাকলে তা সংশোধনের জন্য আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের অনলাইন সেবার মাধ্যমে ঘরে বসেই অনেক ধরনের সংশোধনের আবেদন করা যায়। তবে কোন তথ্য সংশোধন করতে চান, তার ওপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও যাচাইয়ের ধরন নির্ভর করে।
অনেকেই জানতে চান, এনআইডি সংশোধনের নিয়ম কী, অনলাইনে কীভাবে আবেদন করতে হয়, কী কী কাগজপত্র লাগে এবং সংশোধনের জন্য কত টাকা ফি দিতে হয়? এই গাইডে এনআইডি সংশোধনের আবেদন থেকে শুরু করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ও আবেদন যাচাইয়ের বিষয়গুলো তুলে ধরা হলো।
এনআইডি সংশোধন কী?
জাতীয় পরিচয়পত্রে থাকা কোনো ব্যক্তিগত বা অন্যান্য তথ্য ভুল হলে নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় সেটি পরিবর্তন বা ঠিক করার আবেদন করাকে এনআইডি সংশোধন বলা হয়।
সাধারণত নিচের তথ্যগুলো সংশোধনের প্রয়োজন হতে পারে:
– নিজের নামের বানান বা সম্পূর্ণ নাম
– বাংলা ও ইংরেজি নাম
– জন্মতারিখ
– পিতা ও মাতার নাম
– স্বামী বা স্ত্রীর নাম
– বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা
– পেশা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত তথ্য
নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী, সংশোধনের আবেদনের সঙ্গে তথ্যের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিতে হয়। আবেদনকারীর শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে এসএসসি বা সমমানের সনদকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
National Institute of Design and Welfare+1
এনআইডি সংশোধনের নিয়ম ২০২৬: অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে
এনআইডি সংশোধনের জন্য নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।
১. সরকারি NID ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন
প্রথমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র সেবার ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন।
সরকারি ওয়েবসাইট: NID Online Services।
এরপর অ্যাকাউন্টে লগইন করুন। আগে অ্যাকাউন্ট তৈরি করা না থাকলে প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে নিবন্ধন সম্পন্ন করুন।
২. নিজের প্রোফাইলের তথ্য যাচাই করুন
লগইন করার পর আপনার ব্যক্তিগত তথ্য, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য দেখতে পাবেন। যে তথ্যটি সংশোধন করতে চান, সেটি ভালোভাবে চিহ্নিত করুন।
সংশোধনের আগে নিশ্চিত হোন যে আপনার কাছে সঠিক তথ্যের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণপত্র রয়েছে।
৩. সংশোধনের জন্য তথ্য নির্বাচন করুন
প্রোফাইলের সংশ্লিষ্ট তথ্য সম্পাদনার অপশন থেকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন করুন।
যেমন:
– নিজের নাম ভুল হলে নাম সংশোধন করুন।
– জন্মতারিখ ভুল হলে সঠিক জন্মতারিখ দিন।
– পিতা বা মাতার নাম ভুল হলে সংশ্লিষ্ট তথ্য পরিবর্তন করুন।
– ঠিকানা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে ঠিকানাসংক্রান্ত সেবা নির্বাচন করুন।
সব ধরনের ঠিকানা পরিবর্তন অনলাইনে একইভাবে সম্পন্ন হয় না। ভোটার এলাকা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হতে পারে।
৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করুন
আপনি যে তথ্য সংশোধন করতে চান, তার পক্ষে গ্রহণযোগ্য কাগজপত্র স্ক্যান করে আপলোড করুন।
উদাহরণ হিসেবে:
– নাম সংশোধনে শিক্ষাগত সনদ বা জন্মনিবন্ধন।
– জন্মতারিখ সংশোধনে এসএসসি বা সমমানের সনদ, জন্মনিবন্ধন বা গ্রহণযোগ্য সরকারি নথি।
– পিতা-মাতার নাম সংশোধনে তাঁদের NID, জন্মনিবন্ধন বা অন্যান্য প্রমাণপত্র।
– ঠিকানা সংশোধনে ইউটিলিটি বিল বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়নপত্র।
কোনো নির্দিষ্ট কাগজপত্র সব ধরনের সংশোধনের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। সংশোধনের ধরন অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় দলিল নির্ধারণ করে।
National Institute of Design and Welfare+1
৫. নির্ধারিত ফি পরিশোধ করুন
সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য সরকারি ফি দিতে হবে। আবেদন করার সময় পোর্টালে প্রদর্শিত ফি যাচাই করে পরিশোধ করুন।
ফি জমা দেওয়ার পর পেমেন্টের রসিদ সংরক্ষণ করুন।
৬. আবেদন জমা দিয়ে ট্র্যাকিং করুন
সব তথ্য ও কাগজপত্র যাচাই করে আবেদন চূড়ান্তভাবে জমা দিন। এরপর আবেদন নম্বর বা প্রয়োজনীয় ট্র্যাকিং তথ্য সংরক্ষণ করুন।
আবেদন পর্যালোচনার সময় নির্বাচন কমিশন প্রয়োজন মনে করলে অতিরিক্ত কাগজপত্র চাইতে পারে অথবা সরাসরি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট অফিসে যোগাযোগ করতে বলতে পারে।
৭. সংশোধিত এনআইডি সংগ্রহ করুন
আবেদন অনুমোদিত হলে সংশোধিত তথ্য অনলাইন অ্যাকাউন্টে দেখা যাবে। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধিত NID-এর ডিজিটাল কপি ডাউনলোড করতে পারবেন। স্মার্ট কার্ড বিতরণের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
এনআইডি সংশোধনের জন্য কী কী কাগজপত্র লাগে?
সংশোধনের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আলাদা হতে পারে। সাধারণত নিচের ডকুমেন্টগুলো কাজে লাগে:
সংশোধনের ধরন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র
নিজের নাম সংশোধন এসএসসি বা সমমানের সনদ, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট
জন্মতারিখ সংশোধন শিক্ষাগত সনদ, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট
পিতার নাম সংশোধন পিতার NID, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ
মাতার নাম সংশোধন মাতার NID, জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ
স্বামী বা স্ত্রীর নাম বিবাহ সনদ, নিকাহনামা বা তালাকের কাগজপত্র
ঠিকানা সংশোধন ইউটিলিটি বিল, নাগরিক সনদ, পরিবারের সদস্যের NID
নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংশোধনের পক্ষে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র জমা দিতে হবে। এসএসসি বা সমমানের সনদ থাকলে সেটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
National Institute of Design and Welfare+1
এনআইডি সংশোধন করতে কত টাকা লাগে?
এনআইডি সংশোধনের ফি সংশোধনের ধরন ও আবেদনের ক্যাটাগরির ওপর নির্ভর করে। তাই সবার জন্য একই ফি প্রযোজ্য নয়।
আবেদন করার সময় সরকারি NID পোর্টালে সংশোধনের ধরন নির্বাচন করলে প্রযোজ্য ফি দেখা যাবে। পেমেন্ট করার আগে সেই পরিমাণ যাচাই করুন।
সরকারি ফি ও সেবার তথ্য দেখতে পারেন:
– নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সেবার ফি
– জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ
এনআইডি সংশোধনের আবেদন কত দিনে অনুমোদন হয়?
এনআইডি সংশোধনের জন্য নির্দিষ্ট একটি সময় সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সাধারণ বানান সংশোধন এবং জন্মতারিখ বা সম্পূর্ণ নাম পরিবর্তনের মতো জটিল সংশোধনের যাচাই প্রক্রিয়া এক নয়।
প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকলে আবেদন প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে। তবে অতিরিক্ত যাচাই বা প্রমাণপত্রের প্রয়োজন হলে বেশি সময় লাগতে পারে।
২০২৬ সালের ২৫ জানুয়ারি নির্বাচন কমিশন সব ক্যাটাগরিতে এনআইডি সংশোধনের আবেদন গ্রহণ পুনরায় চালুর ঘোষণা দিয়েছিল।
News
এনআইডি সংশোধনের আবেদন বাতিল হলে কী করবেন?
আপনার আবেদন বাতিল হলে প্রথমে বাতিলের কারণ জানতে হবে। এরপর প্রয়োজনীয় তথ্য ও প্রমাণপত্র ঠিক করে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নিন।
কোনো তথ্যের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকলে নতুন করে আবেদন করার আগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করুন।
এনআইডি সংশোধন নিয়ে সাধারণ প্রশ্ন ও উত্তর
১. ঘরে বসে কি এনআইডি সংশোধন করা যায়?
হ্যাঁ। অনেক ধরনের সংশোধনের আবেদন অনলাইনে করা যায়। তবে প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে উপস্থিত হতে হতে পারে।
২. এসএসসি সার্টিফিকেট ছাড়া এনআইডি সংশোধন করা যাবে?
কিছু ক্ষেত্রে সম্ভব। জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, নাগরিকত্ব সনদসহ অন্যান্য গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্রের ভিত্তিতে আবেদন করা যায়। তবে সংশোধনের ধরন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৩. এনআইডিতে জন্মতারিখ পরিবর্তন করা যায়?
হ্যাঁ। তবে জন্মতারিখ সংশোধনের ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য প্রমাণপত্র ও অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হতে পারে।
৪. এনআইডির ঠিকানা পরিবর্তন করা যায়?
হ্যাঁ। তবে শুধু ঠিকানার বানান বা নম্বর সংশোধন এবং ভোটার এলাকা পরিবর্তন এক বিষয় নয়। ভোটার এলাকা পরিবর্তনের জন্য নির্ধারিত আবেদন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়।
৫. এনআইডি সংশোধনের জন্য কোথায় যোগাযোগ করব?
নির্বাচন কমিশনের হেল্পলাইন ১০৫ নম্বরে যোগাযোগ করতে পারেন। সরকারি নির্দেশনা ও সেবার তথ্য NID ওয়েবসাইটেও পাওয়া যায়।
শেষ কথা
জাতীয় পরিচয়পত্রে ভুল থাকলে দেরি না করে সঠিক প্রমাণপত্র সংগ্রহ করে সংশোধনের আবেদন করুন। বিশেষ করে নাম ও জন্মতারিখের ভুল ভবিষ্যতে পাসপোর্ট, ব্যাংকিং, চাকরি কিংবা সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করতে পারে।
তাই আবেদন করার আগে সব তথ্য যাচাই করুন এবং শুধু নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করুন।








