ভারতের সাবেক ক্রিকেটার ও সাবেক তৃণমূল কংগ্রেসের সংসদ সদস্য ইউসুফ পাঠানকে বরোদায় প্রায় ২০ কোটি ৫৩ লাখ রুপি মূল্যের একটি জমি বরাদ্দ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে গুজরাট সরকার। জমিটি বরোদা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (ভিএমসি) মালিকানাধীন। দীর্ঘদিনের বিরোধ ও আইনি জটিলতার পর সরকারের অনুমোদন এলেও বরাদ্দের প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, জমির ৯৭৮ বর্গমিটারের মধ্যে ৫০০ বর্গমিটার আবাসিক ব্যবহারের জন্য পাঠানকে দেওয়া হবে। বাকি ৪৭৮ বর্গমিটার তাঁকে নির্ধারিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে কিনতে হবে। তবে এ প্রস্তাব কার্যকর করতে ভিএমসির স্থায়ী কমিটি ও সাধারণ বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন।
কীভাবে জমি বরাদ্দের প্রস্তাব এলো
বরোদার তান্দালজা এলাকার টাউন প্ল্যানিং স্কিম-২২-এর ৯০ নম্বর চূড়ান্ত প্লটটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছে। ভিএমসির ভূমি ও সম্পত্তি বিভাগ জমিটি বরাদ্দের প্রস্তাব তৈরি করেছে।
ভিএমসির অনুমোদিত মূল্যায়ন অনুযায়ী, জমিটির প্রতি বর্গমিটারের দাম ২ লাখ ১০ হাজার রুপি। সে হিসাবে পুরো ৯৭৮ বর্গমিটার জমির আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়ায় ২০ কোটি ৫৩ লাখ রুপি।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ৫০০ বর্গমিটার জমি উপহার হিসেবে দেওয়া হবে। বাকি ৪৭৮ বর্গমিটার জমির মূল্য নির্ধারণ করা হবে মূল্যায়িত দামের ৫৫ শতাংশ ধরে। অর্থাৎ, ওই অংশ কেনার ক্ষেত্রে পাঠান ৪৫ শতাংশ ছাড় পাবেন।
ভিএমসির অনুমোদন এখনো বাকি
ভিএমসির কমিশনার অরুণ মহেশ বাবু জানিয়েছেন, ইউসুফ পাঠানের জমির বিষয়ে রাজ্য সরকারের অনুমোদন এসেছে। তবে প্রস্তাবের বিস্তারিত শর্ত এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে প্রস্তাবটি ভিএমসির স্থায়ী কমিটিতে উপস্থাপন করা হবে। সেখানকার প্রক্রিয়া শেষে সাধারণ বোর্ডের অনুমোদনের জন্য তোলা হবে। ফলে সরকারের অনুমোদন এলেও জমি বরাদ্দের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া এখনো বাকি রয়েছে।
২০১২ সালে শুরু হয় জমি নিয়ে বিরোধ
ইউসুফ পাঠান ২০১২ সালে তাঁর পরিবারের বাড়ির পাশের জমিটি ৯৯ বছরের ইজারায় দেওয়ার আবেদন করেছিলেন। আবেদনে তিনি নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার হিসেবে তাঁর পরিচিতির কারণে নিরাপত্তাঝুঁকি থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাড়ির পাশে জমিটি থাকলে সুবিধা হবে বলেও আবেদনে জানান।
সে সময় ভিএমসির স্থায়ী কমিটি ও সাধারণ বোর্ড নিলাম ছাড়াই জমিটি সরাসরি পাঠানকে দেওয়ার প্রস্তাবে সম্মত হয়। পরে বিষয়টি রাজ্য সরকারের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়।
তবে ২০১৪ সালের জুনে গুজরাট সরকারের নগর উন্নয়ন বিভাগ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। বিভাগের যুক্তি ছিল, এ ধরনের মূল্যবান জমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রকাশ্য নিলাম বা উন্মুক্ত দরপত্রের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
জমি দখলের অভিযোগ ও আদালতের হস্তক্ষেপ
ভিএমসির অভিযোগ, সরকারের অনুমোদন না পাওয়ার পরও ইউসুফ পাঠান জমিটিতে বেড়া দিয়ে দখলে রেখেছিলেন। ২০২৪ সালের জুনে বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে। ওই সময় ভিএমসি তাঁকে নোটিশ দিয়ে কথিত দখল সরানোর নির্দেশ দেয়।
এর বিরুদ্ধে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন পাঠান। তাঁর আইনজীবীরা আন্তর্জাতিক ক্রীড়াবিদদের জমি বরাদ্দ দেওয়ার সরকারি নীতির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। অন্যদিকে, ভিএমসি জানায়, জমিটি পৌরসভার সম্পত্তি এবং নিয়ম মেনেই তা বরাদ্দ দিতে হবে।
২০২৫ সালের আগস্টে হাইকোর্ট সরকারের আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। আদালত পর্যবেক্ষণ করে, বরাদ্দের আদেশ ও মূল্য পরিশোধ ছাড়া দীর্ঘদিন সরকারি জমি দখলে রাখলেই সেখানে আইনগত অধিকার তৈরি হয় না।
আপিলের শুনানিতে আদালতের প্রশ্ন
হাইকোর্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করেন ইউসুফ পাঠান। ২০২৬ সালের জুনে শুনানির সময় ডিভিশন বেঞ্চ প্রশ্ন তোলে, বরাদ্দের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না করে এবং অর্থ পরিশোধ ছাড়াই কীভাবে তিনি সরকারি জমির দখলে ছিলেন।
আদালত সতর্ক করে জানায়, দখল অব্যাহত থাকলে তাঁর আর্থিক দায় বাড়তে পারে। পরে ৩১ আগস্ট পাঠান কোনো শর্ত ছাড়াই আপিল প্রত্যাহার করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টের শেষ দিকে রাজ্য সরকারের আদেশ ভিএমসির কাছে পৌঁছায়। এরপর পাঠান তাঁর আপিল প্রত্যাহার করেন। নতুন সরকারি সিদ্ধান্তে জমি বরাদ্দের পথ তৈরি হলেও প্রস্তাবটির পরবর্তী অনুমোদন এখনো প্রয়োজন।
জমি বরাদ্দে ভবিষ্যতের জন্য নজির হবে না
সরকারি আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, ইউসুফ পাঠানকে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের অনুরূপ কোনো মামলার ক্ষেত্রে নজির হিসেবে বিবেচিত হবে না। পাশাপাশি রাজস্ব বিভাগ ভিএমসিকে সমমূল্যের অন্য জমি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
এদিকে, ২০২৬ সালের ১৪ জুন তৃণমূল কংগ্রেস ছেড়ে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়ায় (এনসিপিআই) যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন ইউসুফ পাঠান ও দলটির আরও কয়েকজন সংসদ সদস্য। পরে পাঠান দলটির জাতীয় সহসভাপতি হন।
দল পরিবর্তনের কয়েক মাসের মধ্যে জমি বরাদ্দ নিয়ে গুজরাট সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত সামনে এলেও, প্রস্তাবটির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ভিএমসির স্থায়ী কমিটি ও সাধারণ বোর্ডের অনুমোদনের ওপর।









