সরকার গঠনের সাড়ে আট মাসের মধ্যে দুই মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী ও একজন সংসদ সদস্যের পদ হারানোর ঘটনা সরকারের ভেতরে জবাবদিহির প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিভিন্ন অভিযোগের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তাঁদের পদ ছাড়তে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মন্ত্রিসভার সদস্য ও ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সতর্কতা বেড়েছে।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে দলীয় বিরোধ, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সঙ্গে গোপন বৈঠকের অভিযোগ এবং জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার দাবি। সংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলো সামনে আসার পর প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত পদক্ষেপকে সরকারের ভেতরে কঠোর বার্তা হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।
মন্ত্রী-এমপিদের জন্য জবাবদিহির বার্তা
প্রধানমন্ত্রীর এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সরকার ও দলে কেউ অপরিহার্য নন, এমন বার্তা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ ওঠার পর ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যেও সতর্কতা তৈরি করেছে।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান এ বিষয়ে বলেছেন, সরকারের কেউই অপরিহার্য নন, বিষয়টি মন্ত্রিসভার সদস্যদের কাছে পরিষ্কার হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো মন্ত্রী বা সংসদ সদস্য মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থি কাজ করলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের বিষয়টি মনে রাখা প্রয়োজন।
সাবেক সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, দেশ পরিচালনার জন্য সৎ, দক্ষ ও নিষ্ঠাবান ব্যক্তিদের প্রয়োজন। তাঁর মতে, একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি সততা ও একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করলে তাঁর দলও কাজে সহায়তা করে। বর্তমান মন্ত্রিসভার আরও কয়েকজন সদস্যের কথা ও কাজ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি শারীরিক অসুস্থতার কথা উল্লেখ করেছিলেন। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধও তাঁর পদত্যাগের পেছনে ভূমিকা রেখেছিল বলে জানা গেছে।
দলের ভেতরে বিভিন্ন বিষয়ে মতের অমিলের কারণে তাঁকে দায়িত্ব ছাড়তে হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জহির উদ্দিন স্বপনের দায়িত্ব পরিবর্তন
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে জহির উদ্দিন স্বপনকে সরিয়ে আন্দালিভ রহমান পার্থকে মন্ত্রী করা হয়। পরে জহির উদ্দিন স্বপনকে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পদত্যাগপত্রে জহির উদ্দিন স্বপন কারণ উল্লেখ করেননি। তবে ঢাকা ক্লাবে এক সাংবাদিকের স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের খবর আলোচনায় এসেছিল। ওই সাংবাদিক তখন কারাগারে আটক ছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয়ের কিছু বিষয়েও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।
ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ
সর্বশেষ সোমবার মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের পর গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, দল চায়নি বলেই তিনি পদ ছেড়েছেন। তাঁর দাবি, গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী অভিযান দেখতে গিয়েছিলেন এবং কোনো অনিয়ম বা বেআইনি কাজে যুক্ত ছিলেন না।
ওই অভিযানের সময় ইশরাক হোসেনকে হাতে অস্ত্র নিয়ে দৌড়াতে দেখা যায়। তাঁর সহযোগীদের হাতেও আগ্নেয়াস্ত্র দেখা যায়। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা তৈরি হয়।
একজন প্রতিমন্ত্রী এভাবে অস্ত্র হাতে অভিযান পরিচালনা করতে পারেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এ ধরনের অভিযানে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা এবং পুলিশের দায়িত্ব নিয়েও আলোচনা শুরু হয়। পরে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ইশরাক হোসেন পদত্যাগ করেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির পদত্যাগ
এর আগে গত ১ অক্টোবর মিরপুরের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত রাড্ডা ক্লিনিকে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তিনি স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন।
একের পর এক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের পদত্যাগের ঘটনা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। অভিযোগের মুখে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকার ও দলের ভেতরে দায়িত্ব পালনে সতর্ক থাকার বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।








