বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমতে থাকায় মূল্যবান এই ধাতুর দর আরও কমার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা—সব মিলিয়ে স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) স্পট মার্কেটে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম কমে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৯৯৫ দশমিক ৮০ ডলারে। দিনের লেনদেনে একপর্যায়ে দাম নেমেছিল ৩ হাজার ৯৭৫ দশমিক ৬৪ ডলারে। গত এক সপ্তাহে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম কমেছে প্রায় ৪ শতাংশ।
## জানুয়ারির সর্বোচ্চ দাম থেকে বড় পতন
চলতি বছরের জানুয়ারিতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে পৌঁছেছিল। এরপর থেকে দাম প্রায় ২৯ শতাংশ কমেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইয়াহু ফাইন্যান্সে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণেও স্বর্ণের দামের ওপর চাপ তৈরির কয়েকটি কারণ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা, মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ এবং মার্কিন ডলারের শক্তিশালী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা।
সাধারণত অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতার সময় স্বর্ণকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এবার প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের দরপতনের পাশাপাশি স্বর্ণের দামও কমেছে। ফলে বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বর্ণের নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
## স্বর্ণের দামের গুরুত্বপূর্ণ স্তর ৩,৯৪৩ ডলার
ব্যাংক অব আমেরিকার কৌশলবিদ পল সিয়ানার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতি আউন্স ৩ হাজার ৯৪৩ ডলার স্বর্ণের দামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি স্তর।
তাঁর মতে, জুলাইয়ে এই পর্যায়ে নেমেছিল স্বর্ণের দাম। বর্তমান বাজারেও এ স্তর ধরে রাখতে পারলে দাম পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে দাম ৩ হাজার ৯৪৩ ডলারের নিচে নেমে গেলে পরবর্তী সময়ে তা প্রথমে ৩ হাজার ৮৮৬ ডলার এবং পরে ৩ হাজার ৭০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে তাঁর বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থাৎ, স্বর্ণের দাম কোন দিকে যাবে, তা নির্ধারণে এই মূল্যস্তরগুলো বাজার পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে এগুলো বিশ্লেষণভিত্তিক সম্ভাব্য স্তর, নিশ্চিত মূল্যপূর্বাভাস নয়।
## স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা কী বলছে ব্যাংক অব আমেরিকা?
পল সিয়ানার উল্লেখ করা বিনিয়োগ কৌশল অনুযায়ী, ৪ হাজার ডলারের নিচে ধাপে ধাপে স্বর্ণ কেনার পরিকল্পনা রয়েছে। দাম আরও কমে ৩ হাজার ৭০০ ডলারের কাছাকাছি এলে অতিরিক্ত কেনার কথা বিবেচনা করা হতে পারে।
এ ছাড়া ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ২৫০ ডলারের মধ্যে অবশিষ্ট বিনিয়োগ সম্পন্ন করার পরিকল্পনার কথাও তিনি জানিয়েছেন।
এই কৌশল থেকে বোঝা যায়, বাজারে স্বর্ণের দাম আরও কমার সম্ভাবনা বিবেচনায় রেখেই ধাপে ধাপে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এটি সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকের বিনিয়োগ কৌশল; সব বিনিয়োগকারীর জন্য একই সিদ্ধান্ত উপযুক্ত হবে, এমন নয়।
## ২০২৭ সালে দাম বাড়ার পূর্বাভাসও রয়েছে
স্বল্প মেয়াদে স্বর্ণের দামে আরও পতনের আশঙ্কা থাকলেও দীর্ঘ মেয়াদে দাম বাড়ার পূর্বাভাস দিয়েছে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
ইউবিএসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৪০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। গোল্ডম্যান স্যাকসও ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ একই মূল্যলক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
অর্থাৎ, বাজারের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। কেউ স্বল্প মেয়াদে আরও দরপতনের ঝুঁকি দেখছেন, আবার কেউ দীর্ঘ মেয়াদে দাম বাড়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করছেন।
এই পূর্বাভাসগুলো বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নির্ভর করবে বৈশ্বিক অর্থনীতি, সুদের হার, ডলারের মূল্য, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
## মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও তেলের দাম কেন গুরুত্বপূর্ণ?
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার কারণে জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে তেলের দাম বাড়লে বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ আবারও বাড়তে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে। এতে স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কারণ, স্বর্ণ থেকে সরাসরি সুদ পাওয়া যায় না। অন্যদিকে সুদযুক্ত সম্পদের মুনাফা বাড়লে বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বর্ণের তুলনায় সেসব সম্পদ আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে মার্কিন ডলারের মূল্য বাড়লেও আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দামে চাপ তৈরি হতে পারে। ফলে তেলের বাজার, মূল্যস্ফীতি, সুদের হার ও ডলারের গতিবিধি—সবকিছুই এখন স্বর্ণের দামের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
## ফেডের বৈঠকের দিকে নজর বিনিয়োগকারীদের
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের ২৭ ও ২৮ অক্টোবরের বৈঠকের দিকে নজর রাখছেন বিনিয়োগকারীরা।
বাজারে সুদের হার অপরিবর্তিত থাকার প্রত্যাশা থাকলেও ডিসেম্বরে সুদের হার বাড়তে পারে—এমন ধারণাও জোরালো হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফেডের সিদ্ধান্ত ও ভবিষ্যৎ নীতিসংক্রান্ত ইঙ্গিত স্বর্ণের বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে। সুদের হার বাড়ানোর সম্ভাবনা জোরালো হলে স্বর্ণের ওপর চাপ বাড়তে পারে। অন্যদিকে সুদের হার নিয়ে প্রত্যাশা বদলে গেলে বাজারের গতিপথও পরিবর্তিত হতে পারে।
## সামনে স্বর্ণের দাম কোন দিকে যাবে?
আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম বর্তমানে একাধিক অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। একদিকে তেলের দাম ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ, অন্যদিকে সুদের হার ও ডলারের শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা স্বর্ণের বাজারে চাপ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ মূল্যস্তরগুলো ধরে রাখতে না পারলে স্বর্ণের দাম আরও কমতে পারে। তবে ইউবিএস ও গোল্ডম্যান স্যাকসের মতো প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনাও উঠে এসেছে।
তাই স্বর্ণের দাম নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে বাজারের সাম্প্রতিক গতিবিধি, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি এবং বিনিয়োগের ঝুঁকি বিবেচনা করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম কমলেই বাংলাদেশে একই হারে খুচরা দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই; স্থানীয় দাম নির্ধারণে বিনিময় হার, আমদানি ও অন্যান্য ব্যয়ও প্রভাব ফেলতে পারে।









