১৭ ঘণ্টা পর গভীর রাতে দাফন মানিক পশারীর, কবর খুঁড়লেন পরিবারের নারীরা
মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী মানিক পশারীকে মৃত্যুর প্রায় ১৭ ঘণ্টা পর দাফন করা হয়েছে। পিরোজপুরের সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামে তাঁর বাড়িতে রোববার (২৫ অক্টোবর) রাত ২টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়।
পরিবারের সদস্যদের বরাত দিয়ে জানা যায়, মরদেহ বাড়িতে নেওয়া এবং কবর খোঁড়া নিয়ে বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। শেষ পর্যন্ত পুলিশের নিরাপত্তায় পরিবারের নারীরা কবর খুঁড়ে দাফন সম্পন্ন করেন। এ সময় কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাও উপস্থিত ছিলেন।
মরদেহ ঘিরে উত্তেজনা, নেওয়া হয় পুলিশ লাইনে
মানিক পশারী ৮৭ বছর বয়সে শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মারা যান। সেখানে তিনি পলাতক অবস্থায় মেয়ের জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
মৃত্যুর পর তাঁর মরদেহ পিরোজপুরে নেওয়া হয়। শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে মরদেহ পৌঁছালে জেলা জামায়াতের নেতাকর্মী ও স্থানীয়দের তোপের মুখে পড়েন স্বজনরা। পরিস্থিতির মধ্যে পুলিশের সহায়তায় মরদেহ সেখান থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনে নেওয়া হয়।
পরে বিকাল ৫টার দিকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। এরপর মরদেহের নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েন রাখা হয়।
রাত ১টার দিকে বাড়িতে পৌঁছায় মরদেহ
দীর্ঘ সময় পুলিশ লাইনে থাকার পর রাত ১টার দিকে জেলা জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের সহযোগিতায় মানিক পশারীর মরদেহ তাঁর বাড়িতে পৌঁছায় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এরপর পরিবারের সদস্যরা দাফনের প্রস্তুতি নেন। রাত ২টার দিকে দাফন সম্পন্ন হয়। পরিবারের নারী সদস্যরা নিজেরাই কবর খুঁড়ে দাফনের কাজ শেষ করেন।
মানিক পশারীর বোন বলেন, ‘আমার ভাইরে টুঙ্গিপাড়া দিয়া পিরোজপুর আনার পর ওখানে ধস্তাধস্তি হইছে। একবার মোরা কবর খুঁড়ছি সেই কবর লোকজনে আবার ভরাট করে ফেলছে। আবার মোরা কবর খুঁড়ছি এবং পুলিশ লাশ আনার পর মোরাই মাডি দিছি। কোনো পুরুষ মানুষ আয় নাই।’
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রথমবার কবর খোঁড়ার পর সেটি আবার ভরাট করে দেওয়া হয়েছিল। পরে দ্বিতীয়বার কবর খুঁড়ে পরিবারের সদস্যরা দাফন সম্পন্ন করেন।
দাফনে বাধা দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার জামায়াতের
মানিক পশারীর দাফন নিয়ে কোনো বাধা সৃষ্টি করা হয়নি বলে দাবি করেছেন পিরোজপুর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, জেলা জামায়াত ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা দাফনে বাধা দেননি। তাঁর ভাষ্য, জামায়াতে ইসলামী লাশের রাজনীতি করে না। বরং সদর থানা পুলিশকে সহযোগিতা করে দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে পরিবারের সদস্যদের বক্তব্যে মরদেহ আনা ও কবর খোঁড়ার সময় বাধার মুখে পড়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।
পুলিশের নিরাপত্তায় দাফন, কবরের পাশে অতিরিক্ত সদস্য
পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শরিফুল ইসলাম জানান, পুলিশের নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মানিক পশারীর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় কবরের পাশে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
মরদেহ ঘিরে উত্তেজনা এবং দাফনের আগে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিষয়ে প্রতিবেদনে পুলিশের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
কে ছিলেন মানিক পশারী?
মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও রাষ্ট্রপক্ষের অন্যতম প্রধান সাক্ষী ছিলেন।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর মরদেহ নিজ এলাকায় নিয়ে আসা হলেও দাফন সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় পরিবারকে। শেষ পর্যন্ত গভীর রাতে পুলিশের নিরাপত্তায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।









