GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / জীবনযাপন ও স্বাস্থ্য / স্বাস্থ্য / বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ: রয়টার্স

বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশ: রয়টার্স

একসময় হাম নির্মূলের দ্বারপ্রান্তে থাকা বাংলাদেশ বর্তমানে ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি। গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত দেশে হামে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীদের মধ্যে ১,০০২ জনের মৃত্যু হয়েছে। রোগীর চাপ, চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকট এবং প্রতিদিন নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় হাসপাতালগুলোও হিমশিম খাচ্ছে।

বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

বিশেষজ্ঞদের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় রুটিন টিকাদান কর্মসূচি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। গত এপ্রিলে জরুরি ভিত্তিতে দেশজুড়ে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হলেও দীর্ঘস্থায়ী এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্রের (সিডিসি) তালিকা অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব চলছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজনৈতিক গোলযোগের কারণে শিশুদের একটি বড় অংশ টিকাদান থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একই সঙ্গে টিকার সরবরাহেও তৈরি হয়েছে ঘাটতি। বিশেষ করে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা, যাদের নিয়মিত টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, তারাও সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে নতুন করে হাম ছড়িয়ে পড়ার পর দেশে এখন পর্যন্ত সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি। এর মধ্যে ১৯ হাজার ৮৩৫ জনের পরীক্ষাগারে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। এ সময়ে ১ লাখ ৪৬ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। হাম-সংশ্লিষ্ট মৃত্যু হয়েছে ১,০০২ জনের, যার মধ্যে ১০০ জনের মৃত্যু নিশ্চিতভাবে হামের কারণে হয়েছে।

রোগ প্রতিরোধ সক্ষমতার ঘাটতি

বিশেষজ্ঞরা এই প্রাদুর্ভাবের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের দুর্বল তদারকি, অপর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ এবং টিকা ক্রয় নীতির পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন। তাদের মতে, এসব কারণে টিকার প্রাপ্যতা ব্যাহত হয়েছে এবং বহু শিশু হাম থেকে অরক্ষিত হয়ে পড়েছে।

গত সোমবার সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ক্রয়নীতি পরিবর্তনের কারণে বাজারে টিকার চরম সংকট তৈরি হয়েছিল। একই সঙ্গে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টিকাদান কর্মসূচি স্থগিত এবং পরের বছর দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি বাতিল হওয়ায় আরও বেশি শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোও টিকাদানের ঘাটতিকে প্রাদুর্ভাবের অন্যতম মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংক্রমণের শুরুর দিকে আক্রান্তদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু

ডব্লিউএইচওর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে হাম প্রতিরোধে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সাময়িক পতন ছাড়া অধিকাংশ সময় দেশে হাম টিকার কভারেজ ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি ছিল, যা হাম নির্মূলে ডব্লিউএইচওর সুপারিশকৃত মাত্রা।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক ও রোগতত্ত্ববিদ অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে টিকাদানের ঘাটতির কারণে হাম নির্মূলের লক্ষ্য থেকে বাংলাদেশ ছিটকে পড়েছে

তিনি বলেন, বাংলাদেশে আগে কখনো এত বেশি শিশুর মৃত্যু এবং এক বছরে এত বিপুলসংখ্যক হাম রোগী দেখা যায়নি। তার মতে, পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে দ্রুত বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনা, টিকাদান বাড়ানো এবং জনসচেতনতা জোরদার করা প্রয়োজন।

হাম-ডেঙ্গু রোগী সামলাতে চাপে হাসপাতাল

হাম আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ার মধ্যে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যাওয়ায় দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ৪৫ হাজারের বেশি মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মঙ্গলবার ডেঙ্গুতে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই দিনে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৫৭১ জন, যা চলতি বছরে এক দিনে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি ও মৃত্যুর দিক থেকে সর্বোচ্চ।

ঢাকার সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক চিকিৎসক নন্দ দুলাল সাহা বলেন, রোগীর চাপ এত বেশি যে সবাইকে জায়গা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে হাসপাতালটিতে হাম রোগীদের জন্য ৬০টি শয্যা নির্ধারিত রয়েছে। তবে রোগীর চাপ বেশি হওয়ায় অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশুদের হামজনিত উপসর্গ উপশমে সহায়ক পেডিয়াট্রিক স্যালাইনের ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

চিকিৎসক নন্দ দুলাল সাহা আরও জানান, হাসপাতালটির ধারণক্ষমতা ১ হাজার ৩৫০ রোগী হলেও বর্তমানে সেখানে ২ হাজার ৩৫০ জনের বেশি রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

হামের প্রাদুর্ভাব অনেক পরিবারের জন্য দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা, এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে চলা এবং বাড়তি চিকিৎসা ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

৩৫ বছর বয়সী গৃহকর্মী নাসিমা বেগম জানান, প্রায় দুই মাস আগে তার ১৩ মাস বয়সী ছেলে হামে আক্রান্ত হয়। চারটি হাসপাতালে চেষ্টা করেও প্রথমে ছেলের জন্য শয্যা পাননি তিনি। পরে একটি হাসপাতালে ভর্তি করা সম্ভব হয়। ১০ দিন চিকিৎসার পর বাড়িতে নেওয়া হলেও এখনও তার বারবার জ্বর আসছে এবং পুরোপুরি সুস্থ হয়নি।

নাসিমা জানান, অসুস্থ থাকায় তার ছেলে নির্ধারিত সময়ে হাম টিকা নিতে পারেনি। পরে টিকাদান কেন্দ্রে গেলে তাকে জানানো হয়, তখন টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। তবে তার চার বড় সন্তান নিয়মিত টিকা পেয়েছে।

অন্যদিকে কারখানাশ্রমিক মোহাম্মদ রিপনের আট মাস বয়সী মেয়ের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার কয়েক দিন পর শরীরে ফুসকুড়ি ও হামের মতো উপসর্গ দেখা দেয়। এরপর মেয়েকে নিয়ে একাধিক হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যেতে হয় পরিবারটিকে।

রিপন বলেন, তারা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরছেন, কিন্তু সঠিক তথ্য পাচ্ছেন না।

হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বর্তমান সরকার জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এতে ছয় মাস বয়স থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ১ কোটি ৯৭ লাখের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে টিকা না পাওয়া শিশুদের জন্য ‘ক্যাচ-আপ’ টিকাদান কর্মসূচি প্রয়োজন।

Social Icons