দারিদ্র্য, বার্ধক্য আর শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও প্রায় ৭০ বছরের ভালোবাসার সংসার ধরে রেখেছেন শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের বৃদ্ধ সাজু শেখ ও তার স্ত্রী নূরজাহান। বয়স প্রায় ৮০ বছর। একসময় সীমিত আয়ের কাঁচামালের ব্যবসা করে সংসার চালালেও এখন বয়স ও অসুস্থতার কারণে তাদের জীবন কাটছে চরম সংকটে।
প্রায় পাঁচ বছর আগে পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙে যাওয়ার পর থেকে নূরজাহান শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে তার যথাযথ চিকিৎসাও করাতে পারছেন না স্বামী সাজু শেখ।
৭০ বছরের সংসারে সুখ-দুঃখের সঙ্গী
প্রায় ৭০ বছর আগে সাজু শেখ ও নূরজাহানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তারা সাজু শেখের পৈতৃক ভিটায় বসবাস করছেন।
অভাবের সংসারে সাজু শেখ কাঁচামালের ব্যবসা করতেন। আয় ছিল সীমিত। কিন্তু আর্থিক কষ্টের মধ্যেও তাদের দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার ঘাটতি ছিল না।
দীর্ঘ এই সংসারজীবনে তাদের তিন ছেলে ও তিন মেয়ের জন্ম হয়। তিন মেয়ের অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। তারা কেউ কেউ মাঝেমধ্যে বাবা-মায়ের খোঁজ নেন।
সন্তান থাকলেও কাটছে অভাবের জীবন
তাদের তিন ছেলের একজন করোনার সময় নিখোঁজ হয়ে গেলেও মাঝে মাঝে খোঁজ নেন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান এবং বছরে দু-একবার বাড়িতে আসেন।
শেরপুরে থাকা আরেক ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে নিজের মতো করে বৃদ্ধ মা-বাবার ভরণপোষণ ও খোঁজখবর রাখার চেষ্টা করেন।
কিন্তু নূর ইসলামের নিজের সংসারেও রয়েছে আর্থিক টানাপোড়েন। কয়েক বছর আগে তার স্ত্রী চিকিৎসার অভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে বৃদ্ধ মা-বাবার প্রয়োজনীয় খরচও নিয়মিতভাবে বহন করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
পাঁচ বছর ধরে বিছানায় নূরজাহান
প্রায় পাঁচ বছর আগে পা পিছলে পড়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। এরপর থেকেই তিনি বিছানায় শুয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
অর্থের অভাবে তার চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্বামী সাজু শেখ নিজেও বৃদ্ধ। ফলে স্ত্রীকে চিকিৎসকের কাছে নেওয়া কিংবা নিয়মিত চিকিৎসার ব্যবস্থা করাও তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্ত্রীকে কোলে নিয়ে বৃদ্ধ স্বামীর আকুতি
গত ৯ সেপ্টেম্বর ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে স্ত্রী নূরজাহানকে কোলে তুলে নেন সাজু শেখ।
সে সময় কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তিনি আল্লাহর কাছে খাবারের জন্য আকুতি জানান। বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।’
বৃদ্ধ স্বামীর কোলে শয্যাশায়ী স্ত্রী আর তার সেই কান্নার দৃশ্য উপস্থিত মানুষদেরও আবেগাপ্লুত করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও
সাজু শেখের এই আকুতি শুনে স্থানীয় এক ব্যক্তি ঘটনাটি ভিডিও করেন। পরে ভিডিওটি ফেসবুকে প্রকাশ করা হয়।
প্রকাশের পর অল্প সময়ের মধ্যেই ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভাইরাল হয়ে যায়।
ভিডিওটি দেখে অনেকেই এই বৃদ্ধ দম্পতির দীর্ঘদিনের দাম্পত্য জীবন, দারিদ্র্য এবং অসহায়তার বিষয়টি জানতে পারেন।
দারিদ্র্যের মধ্যেও ভালোবাসার বন্ধন
জীবনের শেষ বয়সে এসে সাজু শেখ ও নূরজাহানের দিন কাটছে অভাব ও অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে। একদিকে শয্যাশায়ী স্ত্রী, অন্যদিকে নিজের বার্ধক্য এবং অর্থকষ্ট।
তবুও স্ত্রীকে একা ছেড়ে দেননি সাজু শেখ। অসুস্থ স্ত্রীকে নিজের কোলে তুলে নেওয়ার সেই দৃশ্য যেন তাদের প্রায় সাত দশকের সম্পর্কের আরেকটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
এই বৃদ্ধ দম্পতির কষ্টের গল্প এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় তাদের জীবনযাত্রা ও চিকিৎসার জন্য সহায়তার বিষয়টিও মানুষের আলোচনায় এসেছে।






