দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসার পাশাপাশি রয়েছে পারস্পরিক অধিকার, দায়িত্ব ও বিশ্বস্ততা। রাসুলুল্লাহ (স.) বিভিন্ন হাদিসে এমন কিছু আচরণ থেকে সতর্ক করেছেন, যা স্বামীর অধিকার ক্ষুণ্ন করতে পারে, সংসারে অশান্তি তৈরি করতে পারে কিংবা দাম্পত্যের আস্থা নষ্ট করতে পারে।
এসব নির্দেশনা নারীদের বিরুদ্ধে সাধারণ অভিযোগ নয়। বরং নির্দিষ্ট কিছু আচরণ সম্পর্কে দেওয়া নবীজি (স.)-এর সতর্কবার্তা।
১. অকৃতজ্ঞ ও অবাধ্য হওয়া
দাম্পত্য জীবনে কোনো একটি ঘটনায় অসন্তুষ্ট হয়ে স্বামীর দীর্ঘদিনের ভালোবাসা ও উপকার অস্বীকার করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, তাকে জাহান্নাম দেখানো হয় এবং সেখানে বেশির ভাগ নারীজাতি দেখা যায়। কারণ হিসেবে স্বামীর অবাধ্যতা ও অকৃতজ্ঞতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
(সহিহ বুখারি: ২৯)
তাই অভিমান বা ক্ষোভের সময় স্বামীর আগের সব ভালো কাজ অস্বীকার করা কিংবা কটু ভাষা ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২. বৈধ কারণ ছাড়া দাম্পত্য আহ্বানে সাড়া না দেওয়া
স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্ক উভয়ের বৈধ অধিকার।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, স্বামী স্ত্রীকে শয্যার দিকে আহ্বান করার পর সে অস্বীকৃতি জানালে এবং স্বামী অসন্তুষ্ট অবস্থায় রাত কাটালে সকাল পর্যন্ত ফেরেশতারা তার ওপর লানত করতে থাকেন।
(সহিহ বুখারি: ৫১৯৩)
তবে বৈধ কারণ থাকলে বিষয়টি আলাদা। একইভাবে এই হাদিসকে জোর-জবরদস্তির অনুমতি হিসেবেও গ্রহণ করা যাবে না। দাম্পত্য সম্পর্কের ভিত্তি হলো পারস্পরিক সম্মান ও সদাচরণ।
৩. স্বামী উপস্থিত থাকলে অনুমতি ছাড়া নফল রোজা রাখা
বিবাহিত জীবনে নফল ইবাদতের ক্ষেত্রেও স্বামীর বৈধ অধিকার বিবেচনার নির্দেশ রয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, স্বামী ঘরে উপস্থিত থাকলে তার অনুমতি ছাড়া কোনো নারী নফল রোজা রাখবে না।
(সহিহ বুখারি: ৫১৯২)
এ বিধান শুধু নফল রোজার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফরজ রোজার বিধান আলাদা।
৪. স্বামীর অনুমতি ছাড়া ঘরে কাউকে প্রবেশ করানো
সংসারের ব্যক্তিগত পরিসর ও নিরাপত্তার বিষয়েও হাদিসে নির্দেশনা রয়েছে।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, স্ত্রী স্বামীর অনুমতি ছাড়া তার ঘরে কাউকে প্রবেশ করাবে না।
(সহিহ বুখারি: ৫১৯৫)
এর সঙ্গে সংসারের ব্যক্তিগত পরিবেশ, পারস্পরিক আস্থা ও নিরাপত্তার বিষয় জড়িত।
৫. যথার্থ কারণ ছাড়া তালাক চাওয়া
সামান্য বিরোধ বা ক্ষোভের কারণে বিচ্ছেদের দাবি করা থেকে সতর্ক করা হয়েছে।
সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, কোনো নারী যথার্থ কারণ ছাড়া স্বামীর কাছে তালাক চাইলে তার জন্য জান্নাতের সুঘ্রাণ নিষিদ্ধ।
(সুনানে আবু দাউদ: ২২২৬)
তবে নির্যাতন, অধিকারহানি, নিরাপত্তাহীনতা বা অসহনীয় দাম্পত্য সমস্যার মতো বাস্তব কারণ থাকলে বিষয়টি ভিন্ন।
৬. স্বামীকে অযথা কষ্ট দেওয়া
দাম্পত্য জীবনে স্বামীকে অকারণে কষ্ট দেওয়া এবং এমন আচরণ করা, যা সংসারে অশান্তি তৈরি করে, তা থেকেও সতর্ক করা হয়েছে।
মুআজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) স্বামীকে কষ্ট দেওয়া ও দাম্পত্য জীবনে অশান্তি সৃষ্টি করার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
(জামে তিরমিজি: ১১৭৪)
তবে এর অর্থ স্বামীর অন্যায় বা জুলুম মেনে নেওয়া নয়। ইসলাম স্বামী-স্ত্রী উভয়কেই একে অপরের সঙ্গে সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে।
দাম্পত্য জীবনের মূল শিক্ষা
এসব হাদিসে স্বামীর কিছু অধিকার ও দাম্পত্য জীবনের কিছু সীমারেখা তুলে ধরা হয়েছে।
একই সঙ্গে ইসলাম স্বামীকেও দায়িত্বশীল করেছে। স্ত্রীর অধিকার আদায়, তার সঙ্গে ভালো আচরণ করা এবং জুলুম থেকে বিরত থাকা স্বামীর দায়িত্ব।
তাই দাম্পত্য সম্পর্ক একতরফা কর্তৃত্বের ওপর নয়, বরং ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, বিশ্বস্ততা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মানের ওপর প্রতিষ্ঠিত।



