যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছেদের লক্ষ্যে একসঙ্গে কাজ করার পরিকল্পনা করছে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্ব। সোমবার ওয়েলসের রাজধানী কার্ডিফে তিন দেশের ফার্স্ট মিনিস্টারদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈঠকে তিন দেশের নেতারা একটি যৌথ ঘোষণায় সই করতে পারেন। সেখানে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ এবং স্বাধীনতার প্রশ্নে গণভোট আয়োজনের অধিকার দাবি করা হতে পারে।
কার্ডিফ বে-এর তীরে অবস্থিত সেন্ট ডেভিড’স হোটেলে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে তিন ফার্স্ট মিনিস্টারের পাশাপাশি আয়ারল্যান্ডের বিরোধী দলের নেতা ও সিন ফেইনের সভাপতি মেরি লু ম্যাকডোনাল্ডও উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বদলে গেছে তিন দেশের রাজনৈতিক চিত্র
স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে বড় পরিবর্তন এসেছে। এবারই প্রথম তিনটি ডিভলভড সরকারের নেতৃত্বে স্বাধীনতাপন্থি দল রয়েছে।
স্কটল্যান্ডে স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির নেতা জন সুইনি ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্বে রয়েছেন।
ওয়েলসে মে মাসের নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় পরাজয়ের পর সবচেয়ে বড় দল হয়েছে প্লেইড কামরু। দলটির নেতা রুন আপ আইওয়ার্থ ওয়েলসের ফার্স্ট মিনিস্টার হয়েছেন।
অন্যদিকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে ২০২২ সালের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেয়েছিল সিন ফেইন। দলটির নেতা মিশেল ও’নিল বর্তমানে ফার্স্ট মিনিস্টারের দায়িত্ব পালন করছেন।
‘বর্তমান ব্যবস্থা টেকসই নয়’
স্কটল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার জন সুইনি মনে করেন, তিন দেশেই স্বাধীনতাপন্থি নেতৃত্ব তৈরি হওয়া যুক্তরাজ্যের বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
তার মতে, ওয়েস্টমিনস্টারকে যুক্তরাজ্য-পরবর্তী সম্ভাব্য ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে।
সুইনি আরও বলেছেন, সাংবিধানিক পরিবর্তনের পক্ষে রাজনৈতিক গতি এখন অস্বীকার করার মতো নয়। কার্ডিফের বৈঠককে তিনি স্বাধীনতার দিকে একটি ‘নতুন শুরু’ হিসেবে দেখছেন।
স্বাধীনতার গণভোট নিয়ে বিতর্ক
তিন নেতার বৈঠকের আগে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গণভোট নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম সম্প্রতি বলেছেন, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে যদি স্পষ্ট ঐকমত্য তৈরি হয়, তাহলে আরেকটি গণভোটের অনুমোদনের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
এই বক্তব্যকে নিজেদের দাবির পক্ষে ব্যবহার করতে চাইছেন স্কটিশ স্বাধীনতাপন্থিরা।
তবে বার্নহাম একই সঙ্গে জানিয়েছেন, পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনের আগে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা নিয়ে আরেকটি গণভোটের প্রশ্ন নেই। তার দাবি, বর্তমানে স্বাধীনতা গণভোটের পক্ষে প্রয়োজনীয় ঐকমত্যও নেই।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড নিয়েও বড় প্রশ্ন
বৈঠকে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
গুড ফ্রাইডে চুক্তি অনুযায়ী, নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তরাজ্য ছাড়তে চান এমন সম্ভাবনা তৈরি হলে আইরিশ পুনরেকত্রীকরণ নিয়ে গণভোট আয়োজনের সুযোগ রয়েছে।
সিন ফেইন মনে করছে, এমন পরিস্থিতির জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন।
দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, প্রতিটি জাতিরই গণতান্ত্রিক উপায়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার রয়েছে।
ইউরোপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে চায় তিন দেশ
কার্ডিফের বৈঠকে অর্থনীতি, জ্বালানি, ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
তিন রাজনৈতিক শক্তিই নিজেদের ভবিষ্যৎ ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করার পক্ষে।
স্কটল্যান্ড ও ওয়েলস স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এগোতে চায়। আর নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রে আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশ হওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
ওয়েলসের আরও ক্ষমতা চায় প্লেইড কামরু
বৈঠকে ওয়েলসের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানোর দাবিও তুলবে প্লেইড কামরু।
দলটি ওয়েলস সরকারের হাতে কর ও সরকারি ব্যয়ের ওপর আরও ক্ষমতা দেওয়ার দাবি করছে। একই সঙ্গে ক্রাউন এস্টেট থেকে পাওয়া রাজস্বের একটি অংশ ওয়েলসকে দেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
অফশোর উইন্ড ফার্ম থেকে পাওয়া আয়সহ বিভিন্ন সম্পদের রাজস্ব বর্তমানে ব্রিটিশ সরকারের কোষাগারে যায়।
প্লেইড কামরু পুলিশ ও রেল খাতের মতো আরও কিছু ক্ষমতা ওয়েলস সরকারের হাতে দেওয়ার দাবিও করছে।
লন্ডনের অবস্থান কী?
তবে লন্ডন এই উদ্যোগকে সমর্থন করছে না।
প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম স্কটল্যান্ডের আরেকটি স্বাধীনতা গণভোটের সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। তার মতে, স্কটল্যান্ডে স্বাধীনতার পক্ষে এখনো কোনো স্পষ্ট ঐকমত্য নেই।
নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ক্ষেত্রেও যুক্তরাজ্য ছাড়ার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ইচ্ছা রয়েছে, এমন স্পষ্ট ভিত্তি নেই বলে তিনি জানিয়েছেন।
বার্নহামের দাবি, স্বাধীনতা ও গণভোটের বিতর্ক অর্থনীতি সচল করা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় থেকে সরকারের মনোযোগ সরিয়ে দিতে পারে।
ট্রাম্পের মন্তব্যে নতুন মাত্রা
এরই মধ্যে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ডাবলিন সফরের সময় তিনি বলেন, একটি ঐক্যবদ্ধ আয়ারল্যান্ড দেখতে তিনি খুবই আগ্রহী। নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড আয়ারল্যান্ড প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত হলে সেটি দারুণ ব্যাপার হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্পের এই মন্তব্য যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সাংবিধানিক অবস্থান নিয়ে বিতর্কে নতুন আন্তর্জাতিক মাত্রা যোগ করেছে।
এখন নজর কার্ডিফের বৈঠকে
সব মিলিয়ে স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই বৈঠক যুক্তরাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্বাধীনতার গণভোট, অর্থনৈতিক ক্ষমতা, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিন দেশের অবস্থান কতটা এক হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
তবে যুক্তরাজ্য এখনই ভেঙে যাচ্ছে, এমন কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বরং কার্ডিফের বৈঠককে স্বাধীনতাপন্থি শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।







