রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের ঝটিকা মিছিল ঘিরে একটি সংগঠিত পরিকল্পনার তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, আত্মগোপনে থাকা ও দেশের বাইরে অবস্থানরত কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার অর্থায়ন ও নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিছিলে অংশ নেওয়া কর্মীদের নগদ অর্থ ও যাতায়াত খরচ দেওয়ার তথ্য তদন্তকারীদের হাতে এসেছে। এসব অর্থের উৎস ও লেনদেনের তথ্য যাচাই করতে হুন্ডি, বিকাশসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের রেকর্ড পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গুলশানের ঝটিকা মিছিল নিয়ে তদন্ত
গত ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি বড় ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। মিছিলের সময় ককটেল বিস্ফোরণেরও খবর পাওয়া যায়।
ঘটনার দিন ও পরদিন অভিযান চালিয়ে মিছিলে সরাসরি অংশ নেওয়া ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা মহানগর পুলিশের বিশেষ অভিযানে আরও ৪০ জনকে গ্রেফতার করা হয়।
সব মিলিয়ে রাজধানীর বিভিন্ন স্থান থেকে আওয়ামী লীগের ৭২ জন নেতাকর্মী গ্রেফতার হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
গুলশানের ঘটনার পর পুলিশের দায়িত্ব ও সম্ভাব্য ব্যর্থতা খতিয়ে দেখতে ডিএমপির পক্ষ থেকে দুই সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
নেপথ্যে অর্থায়নের অভিযোগ
গোয়েন্দা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্রের দাবি, ঝটিকা মিছিলের জন্য মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের অর্থের বিনিময়ে সংগঠিত করা হচ্ছে।
সূত্র অনুযায়ী, এসব অর্থের জোগান সাবেক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী, সংসদ-সদস্য, মেয়র ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বিভিন্ন তহবিল থেকে আসছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
মিছিলে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ টাকা এবং যাতায়াত খরচ দেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্তসংশ্লিষ্টদের।
নেপথ্যে থাকা নেতাদের প্রতিনিধি ও সহযোগীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অর্থ লেনদেন তদারকি করছে বলেও সূত্রের দাবি।
যেসব নেতার নাম এসেছে
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর নাসির উদ্দিনসহ আওয়ামী লীগের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং বিভিন্ন তথ্য যাচাই করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।
নসরুল হামিদ বিপু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকে দেশের বাইরে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে নাসির উদ্দিন তুরাগ থানা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ছিলেন এবং ২০২০ সালের ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন। ২০২৪ সালের আগস্টের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঝটিকা মিছিল বেড়েছে
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে সারা দেশে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে ১৪৩টি ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৪৩টি মামলা এবং ২০৫ জন গ্রেফতারের কথা জানানো হয়েছে।
চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম নয় দিনে ছাত্রলীগের ৩১টি ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় সাতটি মামলা হয়েছে এবং ৫০ জন গ্রেফতার হয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
অন্যদিকে সেপ্টেম্বরের প্রথম ১০ দিনে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ২২টি ঝটিকা মিছিল ও একটি গোপন বৈঠকসহ আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নসংক্রান্ত ৩৬টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে।
ডিবির তদন্তে কী তথ্য মিলেছে?
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের সময় আটক ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অর্থায়ন ও পরিকল্পনার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, গ্রেফতার ব্যক্তিদের কাছ থেকে কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে এবং সেসব তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী ব্যক্তি এবং তাদের পেছনে থাকা অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে ডিবি ও থানা পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আগামী দিনে নজর কোথায়
রাজধানীতে ধারাবাহিক ঝটিকা মিছিল, গ্রেফতার এবং অর্থায়নের অভিযোগের কারণে বিষয়টি এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে রয়েছে।
তবে তদন্তে উঠে আসা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা আদালত বা সংশ্লিষ্ট তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার বিষয়। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, অর্থ লেনদেনের তথ্য এবং কথিত নেপথ্য পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক যাচাই করছে।
ফলে আওয়ামী লীগের এসব ঝটিকা মিছিলের পেছনে কারা অর্থ ও নির্দেশনা দিচ্ছে এবং তাদের উদ্দেশ্য কী, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।







