GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / জাতীয় / মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আগেই বিভ্রান্তি

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আগেই বিভ্রান্তি

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার আগেই বিভ্রান্তি

সরকারি তথ্যের ঘাটতিতে দালাল-এজেন্সির দাপট, ৩৩৮ এজেন্সির তালিকা ঘিরে নতুন প্রশ্ন

দীর্ঘ অপেক্ষার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবারও খুলতে যাচ্ছে। এতে বিদেশে যেতে আগ্রহী হাজারো তরুণের মধ্যে নতুন করে আশার সৃষ্টি হলেও, বাজার খোলার আগেই দেখা দিয়েছে বিভ্রান্তি

মালয়েশিয়া সরকার কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া ও ধাপ প্রায় এক মাস আগে প্রকাশ করলেও বাংলাদেশে তা যথাযথভাবে প্রচার না হওয়ায় অনেক চাকরিপ্রত্যাশী এখনো জানেন না, কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কার মাধ্যমে মালয়েশিয়ায় যেতে পারবেন

এই তথ্যের ঘাটতির সুযোগ নিচ্ছে রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি, দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রচার, চাকরির আশ্বাস এবং দ্রুত মালয়েশিয়া পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারা চাকরিপ্রত্যাশীদের আকৃষ্ট করছেন।

ফলে সরকারি নির্দেশনার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে দালালের কথাই বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠছে

পাসপোর্ট ও টাকা না দেওয়ার সতর্কতা

পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি দিয়ে পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত কাউকে পাসপোর্ট জমা না দিতে, টাকা না দিতে এবং মেডিকেল পরীক্ষা না করাতে বলেছে।

তবে এর মধ্যেই কিছু লাইসেন্সধারী রিক্রুটিং এজেন্সি, ট্রাভেল এজেন্সি ও দালাল তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের প্রচারণায় অনেক তরুণ আকৃষ্ট হচ্ছেন।

এতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে পুরোনো সমস্যাগুলো আবারও ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিদেশে যাওয়ার শুরু থেকে বিমানবন্দরে ওঠা পর্যন্ত কর্মীদের নানা ধরনের হয়রানি, অনিশ্চয়তা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মিথ্যা আশ্বাস, তথ্য গোপন, অতিরিক্ত অর্থ দাবি, পাসপোর্ট আটকে রাখা কিংবা পাসপোর্টের অপব্যবহার নিয়েও অভিযোগ রয়েছে।

পুরোনো অনিয়মের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম পুরোনো ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। তবে কর্মী পাঠানো নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও নতুন নয়।

ভিসা কেনাবেচা, দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুষ, মেডিকেল পরীক্ষা ও বিমান টিকিটে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার মতো অভিযোগ অতীতেও সামনে এসেছে।

এর ফলে বিদেশে গিয়ে চাকরি না পাওয়া, বেতন না পাওয়া, নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হওয়া কিংবা আইনি জটিলতায় পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। অনেকে শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন

৩৩৮ এজেন্সির তালিকা ঘিরে প্রশ্ন

এবার নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য ৩৩৮টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা প্রকাশকে কেন্দ্র করে।

তালিকায় রয়েছে ২৫টি প্রধান এজেন্সি, তাদের অধীনে ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের অধীনে ৬২টি এজেন্সি

তবে প্রশ্ন উঠেছে, এই ২৫০টি সহযোগী এজেন্সি সরাসরি মালয়েশিয়ার নিয়োগদাতার কাছ থেকে চাহিদাপত্র সংগ্রহ ও কর্মী পাঠাতে পারবে কি না, নাকি তারা ২৫টি প্রধান এজেন্সির অধীনে সাব-এজেন্ট হিসেবেই কাজ করবে।

বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অতীতেও ‘সহযোগী এজেন্সি’ কাঠামোর আড়ালে কার্যত সিন্ডিকেট ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল।

খাতসংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দাবি, তালিকায় থাকা কিছু এজেন্সির মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। কিছু প্রধান এজেন্সির বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলামও নতুন ব্যবস্থাকে আগের সিন্ডিকেশন পদ্ধতির সঙ্গে তুলনা করেছেন।

সরকারের বক্তব্য কী

সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, ৩৩৮টি এজেন্সি বাংলাদেশ নির্বাচন করেনি। বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষই তালিকাটি তৈরি করেছে

মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ, পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাশাপাশি দেশটির দুর্নীতি দমন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলো যাচাই-বাছাই করেছে বলে জানানো হয়েছে।

সরকার ৩৩৮টি এজেন্সির অন্তর্ভুক্তিকে ‘ঐতিহাসিক অর্জন’ হিসেবেও বর্ণনা করেছে।

তবে তালিকা প্রকাশ করাই শেষ কথা নয়। বাস্তবে কোন এজেন্সি কীভাবে কাজ করবে, কর্মীর কাছ থেকে কত টাকা নিতে পারবে, চাহিদাপত্র কে সংগ্রহ করবে, সাব-এজেন্টের ভূমিকা কী হবে এবং পুরো প্রক্রিয়া কীভাবে নজরদারি করা হবে, সেসব বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা প্রয়োজন।

তিন মাসে ১০ হাজার কর্মী পাঠানোর উদ্যোগ

এর মধ্যেই বিশেষ ব্যবস্থায় আগামী তিন মাসে ১০ হাজার বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশটির সেবা খাতে শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় এসব কর্মী নিয়োগ করা হবে।

সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। মালয়েশিয়া ডিসেম্বরের মধ্যে ওই খাতে মোট ১৫ হাজার কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা করছে।

২০২৪ সালের ১ জুনের সময়সীমার আগে মালয়েশিয়ায় যেতে না পারা প্রায় ৫ হাজার বাংলাদেশি কর্মীকে প্রথম দফায় অন্তর্ভুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রথম দলকে বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনায় বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। বিমানভাড়াসহ অন্যান্য অভিবাসন ব্যয়ও বহন করার কথা রয়েছে।

এই উদ্যোগ সফল হলে এটি স্বচ্ছ ও নিরাপদ কর্মী পাঠানোর একটি কার্যকর মডেল হতে পারে। তবে প্রশ্ন হলো, শূন্য অভিবাসন ব্যয়ের এই ব্যবস্থা কি সীমিত সংখ্যক কর্মীর মধ্যেই থাকবে, নাকি ভবিষ্যতের বৃহত্তর নিয়োগ ব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়বে।

দালালের ওপর নির্ভরতা কেন

বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের বিএমইটিতে নিবন্ধন করতে হয়। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার, জেলা কর্মসংস্থান অফিস এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বা টিটিসিতেও এ নিবন্ধনের সুযোগ রয়েছে।

তারপরও মালয়েশিয়ায় যেতে আগ্রহী অনেক তরুণকে ঢাকামুখী হতে দেখা যায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, সরকারি সেবাগুলো মানুষের দোরগোড়ায় থাকলেও চাকরিপ্রত্যাশীরা কেন দালাল ও এজেন্সির ওপর বেশি নির্ভর করছেন?

রামরুর গবেষণাতেও উঠে এসেছে, চাকরিপ্রত্যাশীরা অনেক ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে কাছের দালালের তথ্যকে বেশি বিশ্বাস করেন।

এটি শুধু নাগরিক সচেতনতার ঘাটতি নয়। সরকারি তথ্য কত দ্রুত, কতটা সহজ ভাষায় এবং কোন মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

মোবাইলভিত্তিক নিবন্ধন ও আঙুলের ছাপ গ্রহণের ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করা গেলে চাকরিপ্রত্যাশীদের ঢাকায় এসে অযথা অর্থ খরচের প্রয়োজন কমতে পারে।

একই সঙ্গে টিটিসিগুলোকে শুধু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে নয়, নিরাপদ বৈদেশিক কর্মসংস্থানের তথ্য ও পরামর্শকেন্দ্র হিসেবেও গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

শুধু কর্মী পাঠানোর সংখ্যা দিয়ে সাফল্য নয়

বিদেশি শ্রমবাজার খোলা ও বন্ধ হওয়া যেন অনেক ক্ষেত্রে রিক্রুটিং ব্যবসার একটি চক্রে পরিণত হয়েছে।

বাজার বন্ধ থাকলে আগাম প্রচারণা, চাহিদা তৈরি ও অর্থ সংগ্রহ, আর বাজার খুললে তাড়াহুড়ো করে কর্মী পাঠানোর প্রবণতা বন্ধ না হলে একই সংকট আবারও তৈরি হতে পারে।

শুধু কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন, সেই সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপলে চলবে না। কত কম খরচে, কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, কতটা নিরাপদে এবং কতটা দক্ষ কর্মী বিদেশে গেলেন, সেটিই হওয়া উচিত সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড।

বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি তাই শুধু নতুন করে বাজার খোলার খবর নয়। এটি পুরোনো ভুল থেকে বেরিয়ে আসার একটি বড় পরীক্ষা

বর্তমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা। এর আগে নতুন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে সব যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রত্যাশা করছে সরকার।

তবে শেষ পর্যন্ত বড় প্রশ্ন একটাই:

এবার কি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলবে কর্মীর স্বার্থে, নাকি আবারও খুলবে মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের স্বার্থে?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার এবার সত্যিই কতটা ‘নতুন’

Social Icons