শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়ন, শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ এবং শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া ১৫ দফা অনুশাসন বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছে শিক্ষা প্রশাসন। সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
কর্মপরিকল্পনার আওতায় সারা দেশে স্কুল-কলেজের জন্য অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন, শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত পাঠদান নিশ্চিত করা, প্রযুক্তিনির্ভর লাইভ মনিটরিং, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, সহশিক্ষা কার্যক্রম বাড়ানো এবং ভালো কাজের জন্য শিক্ষকদের পুরস্কৃত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য সেরা শিক্ষকদের পাঠদানের সুযোগ তৈরি করতে একটি ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ চালুর সম্ভাব্যতা যাচাই এবং প্রস্তুতিমূলক কাজও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষকদের আচরণবিধি তৈরির উদ্যোগ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আচরণবিধি তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এ বিষয়ে খসড়া পরিমার্জন করে চূড়ান্ত বিধিমালা প্রণয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, অতিমাত্রায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা এবং জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের মূল দায়িত্ব ব্যাহত হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষার পরিবেশ ও ফলাফলের ওপর।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ফলাফল খারাপ হলে শিক্ষকরা তাদের দায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। তার মতে, অতীতে কিছু শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের চেয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি মনোযোগী হওয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও লাইভ মনিটরিং
প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো দেশব্যাপী সময়াবদ্ধ অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন। এর মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদান নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষকদের পাঠদানের মান ও নিয়মিত ক্লাস নেওয়া হচ্ছে কিনা, তা প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।
মাউশির সহকারী পরিচালকরা ‘ডিএমএস অ্যাপ’ ব্যবহার করে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান সরাসরি লাইভ ভিডিও কলে মনিটরিং করবেন। মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল তদারকি জোরদার করতে প্রধান শিক্ষকদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর পিডিএসে আপডেট করাও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
শুরু হচ্ছে এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষক প্রশিক্ষণ
শিক্ষকদের দক্ষতা বাড়াতে চলতি সেপ্টেম্বর থেকেই এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাউশির অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিটি প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ৩ লাখ ৫ হাজার ২৮৮ জন শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষ শিক্ষকদের নিয়ে ‘মাস্টার ট্রেইনার পুল’ এবং ‘টিচার্স এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষকরা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত ভালো চর্চা ও অভিজ্ঞতা অন্য শিক্ষকদের সঙ্গে বিনিময়ের সুযোগ পাবেন।
গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান শিক্ষকের ঘাটতি পূরণ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষক সংকট দ্রুত সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শূন্যপদ পূরণের পাশাপাশি শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণের মান যাচাই এবং শ্রেণিকক্ষে তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতেও মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ডেডিকেটেড প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অব্যবহৃত ভবন শিক্ষক প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহার করা যায় কিনা, সেটিও যাচাই করা হচ্ছে।
জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল চালুর প্রস্তুতি
দেশের যেকোনো প্রান্তের শিক্ষার্থী যাতে সেরা শিক্ষকদের ক্লাস করার সুযোগ পায়, সে লক্ষ্যেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ জন্য একটি ডেডিকেটেড ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংসদ টেলিভিশনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে চ্যানেলটি চালুর খসড়া কর্মপরিকল্পনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মাউশি।
খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্ব
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়মুখী করতে শুধু বইভিত্তিক লেখাপড়া নয়, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন, গণিত অলিম্পিয়াডসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রমের সুযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, আনন্দময় শিক্ষার অভাব, দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, কোচিং নির্ভরতা এবং স্মার্টফোন আসক্তির মতো কারণে মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার প্রবণতা বাড়ছে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় সহশিক্ষা কার্যক্রম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা নির্দেশনা
শিক্ষার মানোন্নয়নে দেওয়া ১৫ দফা অনুশাসনের মধ্যে রয়েছে:
১. খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, চিত্রাঙ্কন ও গণিত অলিম্পিয়াডসহ সহশিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
২. শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতিমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের আচরণবিধি সংশোধন।
৩. দেশব্যাপী অভিন্ন পাঠ পরিকল্পনা ও রুটিন বাস্তবায়ন।
৪. ‘জাতীয় শিক্ষা চ্যানেল’ প্রতিষ্ঠার সম্ভাব্যতা যাচাই।
৫. প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠদান অনলাইনে তদারকি।
৬. শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে মানসম্মত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন।
৭. প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার আগ পর্যন্ত অব্যবহৃত সরকারি ভবন ব্যবহারের সম্ভাব্যতা যাচাই।
৮. গণিত, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বিষয়ের শিক্ষক সংকট দূর করা এবং বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়া।
৯. ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শিক্ষকদের পদক ও পুরস্কার দেওয়া।
১০. কারিগরি, প্রযুক্তিনির্ভর ও কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো।
১১. শিক্ষা পরিকল্পনায় কেন্দ্রীয় গবেষণা ডাটাবেজ তৈরি এবং স্থানীয় চাহিদাকে গুরুত্ব দেওয়া।
১২. প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও শিক্ষা উপকরণ ব্যবহার করে আকর্ষণীয় পাঠদান নিশ্চিত করা।
১৩. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি।
১৪. প্রশিক্ষণের পর শ্রেণিকক্ষে তার বাস্তব প্রয়োগ তাৎক্ষণিকভাবে মূল্যায়ন করা।
১৫. ভালো চর্চা ও সফল অভিজ্ঞতা ছড়িয়ে দিতে শিক্ষকদের ‘এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রাম’ চালু করা।
মাউশির সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলোর অধিকাংশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পেয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর বা মাউশি। গত ২০ আগস্ট মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিভিন্ন উইংয়ের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন এবং সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়।
মাউশি জানিয়েছে, কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ইতোমধ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম এগিয়ে যাচ্ছে এবং এর অগ্রগতি সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।
মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ১৫ দফা অনুশাসন মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা দিয়েছে। প্রতিটি উইংকে নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, এআই প্রশিক্ষণ, অ্যাপভিত্তিক লাইভ মনিটরিং এবং জাতীয় শিক্ষা চ্যানেলের প্রস্তুতি দ্রুত এগিয়ে চলছে।
অনুশাসন বাস্তবায়নের ফোকাল পার্সন মো. শওকত হোসেন মোল্ল্যাও জানিয়েছেন, নির্দেশনাগুলো শতভাগ বাস্তবায়নে নিবিড় মনিটরিং করা হচ্ছে। স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও কারিগরি বিষয়গুলোর জন্য পৃথক পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।







