GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / সারাদেশ / মা ইলিশ শিকারে কোটি টাকার ‘নিরাপত্তা বাণিজ্যের’ অভিযোগ

মা ইলিশ শিকারে কোটি টাকার ‘নিরাপত্তা বাণিজ্যের’ অভিযোগ

মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও বরিশালের হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মেঘনা নদী এবং শাখা নদীগুলোতে অবৈধভাবে মাছ শিকারের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় জেলে ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযান থেকে রক্ষা এবং ধরা ইলিশ বিক্রির সুযোগ করে দেওয়ার বিনিময়ে ট্রলারপ্রতি ২ হাজার টাকা ও মাছ বিক্রির অর্থের ১০ শতাংশ পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হচ্ছে।

এই বাণিজ্যের সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন জেলে ও মৎস্য বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরি। তবে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করে এগুলোকে অপপ্রচার বলে দাবি করেছেন।

নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইলিশ শিকারের অভিযোগ

মা ইলিশ রক্ষায় প্রতিবছর অক্টোবর মাসে নদ-নদীতে ২২ দিনের জন্য মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার। এ বছর ৮ অক্টোবর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। তা বাস্তবায়নে মৎস্য বিভাগ, কোস্ট গার্ড, নৌপুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন অভিযান পরিচালনা করছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, বরিশালের হিজলা উপজেলার অন্তরবাম ও মেহেন্দীগঞ্জের উলানিয়া এলাকায় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে দলবদ্ধভাবে ইলিশ শিকার করছেন বহু জেলে। আশপাশের শাখা নদীগুলোতেও শত শত ট্রলারে মাছ ধরার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযান চালাতে গেলে মৎস্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হামলার মুখে পড়তে হয় বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। গত সপ্তাহেও জেলেদের হামলায় মৎস্য বিভাগের একজন কর্মী আহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অভিযানে জনবল কম থাকলে ওই দুই এলাকায় জেলেদের হামলার ঘটনা ঘটে। জেলেদের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সমস্যায় পড়তে হয়।

ট্রলারপ্রতি ২ হাজার টাকা, বিক্রিতেও ভাগ দেওয়ার অভিযোগ

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন জেলে দাবি করেছেন, মাছ ধরতে যাওয়া প্রতিটি ট্রলারের জন্য ২ হাজার টাকা দিতে হয়। পাশাপাশি ইলিশ বিক্রির জন্য বসা ছয়টি নিলামের হাটে বিক্রির অর্থের ১০ শতাংশও দিতে হয় বলে তাদের অভিযোগ।

জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অর্থ দেওয়ার বিনিময়ে অভিযানের সময় কিছু সুবিধা পাওয়া যায়। তাদের দাবি, ট্রলারে জেলেদের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লোকজনও থাকেন, যারা অভিযানকারী দলকে বাধা দেন। কেউ আটক হলে সবার বিরুদ্ধে সমানভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

জেলেদের দাবি, ট্রলার থেকে নেওয়া অর্থ ও মাছ বিক্রির ভাগ মিলিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতিদিন ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত পান। তবে এই অঙ্কের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

ছয়টি পয়েন্টে বসে ইলিশের নিলাম

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ধরা ইলিশ বিক্রির জন্য হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের ছয়টি পয়েন্টে রাতে নিলামের হাট বসে। সন্ধ্যা থেকে ভোররাত পর্যন্ত এসব হাটে কেনাবেচা চলে। শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের মাছ ব্যবসায়ীরাও সেখানে ইলিশ কিনতে আসেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

জেলে ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বিভিন্ন হাটে অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে নেই।

এ ছাড়া মেমানিয়া ইউনিয়নের টেকেরহাট বাজারের খোলা ইলিশের বাজার থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। সংগৃহীত অর্থ প্রভাবশালীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কাজে কয়েকজনের সম্পৃক্ততার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

আলতাফ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ, অস্বীকার

ট্রলার ও নিলামের হাট থেকে সংগৃহীত অর্থ হিজলা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আলতাফ হোসেন খোকন দপ্তরির কাছে যায় বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। নিষেধাজ্ঞার সময় ইলিশ শিকারের এই বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।

তবে খোকন দপ্তরি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘এসব আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার। আমি কেন নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ শিকারে সহায়তা করতে যাব?’

অভিযোগে নাম আসা আলাউদ্দিনও বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তিনি এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। প্রতিবেদনে উল্লেখিত আরেক ব্যক্তি তাহেরের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

মৎস্য বিভাগের বক্তব্য

জেলেদের দাবি, আটক ব্যক্তিদের সবাইকে শাস্তি দেওয়া হয় না; অনেককে জরিমানা দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হয়। তবে বরিশালের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান এই অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন।

তিনি বলেন, অভিযানে আটক হওয়ার পর গত নয় দিনে কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড ছাড়া কাউকে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটেনি। ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে প্রত্যেকের শাস্তি নিশ্চিত করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

কোনো সুনির্দিষ্ট অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার ক্ষেত্রে অবৈধ মাছ শিকার, চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ এবং অভিযানকারী দলের নিরাপত্তা—সব বিষয়েই নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

সূত্র: যুগান্তর।

Social Icons