GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / জাতীয় / সংসদে বিশৃঙ্খলা: সদস্যদের আচরণ নিয়ে স্পিকারের গভীর উদ্বেগ

সংসদে বিশৃঙ্খলা: সদস্যদের আচরণ নিয়ে স্পিকারের গভীর উদ্বেগ

জাতীয় সংসদে হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ

জাতীয় সংসদে হট্টগোল, বাকবিতণ্ডা ও কার্যপ্রণালী বিধি না মানার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সংসদ সদস্যদের মধ্যে অসহিষ্ণুতা এবং একে অপরের বক্তব্যে বাধা দেওয়ার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সংসদের ভবিষ্যৎ গুরুতর সংকটে পড়বে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। একপর্যায়ে সংসদ সদস্যদের মধ্যে তীব্র হট্টগোল ও বাকবিতণ্ডা শুরু হয়।

এ সময় বক্তব্য দিতে গিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্য শফিকুর রহমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আচরণের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুরু থেকেই বিরোধী দলের সদস্যদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে অসংসদীয় মনোভাব দেখিয়ে আসছেন।

শফিকুর রহমান বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদকে নিজের শ্রেণিকক্ষ এবং নিজেকে শিক্ষক হিসেবে মনে করছেন। অন্যদের শিক্ষার্থীর মতো শাসন করার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে শফিকুর রহমান আরও বলেন, শিক্ষকতা করতে চাইলে তিনি আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় খুলতে পারেন। সেখানে তার পছন্দের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে।

তিনি সরকারের এমন আচরণকে ‘সংসদীয় ফ্যাসিবাদ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে সংসদের মর্যাদা রক্ষায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তার অসংসদীয় বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করার দাবি জানান। বক্তব্যটি কার্যপ্রণালী থেকে বাদ দেওয়ারও দাবি করেন তিনি।

শফিকুর রহমান হুঁশিয়ারি দেন, এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে অপমান সহ্য করে বিরোধী দলের সদস্যরা সংসদে অবস্থান করবেন না।

এরপর সংসদের নিরপেক্ষতা ও কার্যপ্রণালী বিধি অনুসরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন স্পিকার। তিনি বলেন, বহু ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত গণতন্ত্রকে কার্যকর রাখতে হলে সংসদের নিয়মকানুন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা এবং বিরোধী দলের সদস্যদের হট্টগোলের সমালোচনা করেন স্পিকার। তিনি বলেন, সরকারের ভুল-ত্রুটি তুলে ধরার অধিকার বিরোধী দলের রয়েছে। তবে কোনো মন্ত্রীকে বক্তব্য শেষ করতে না দিয়ে একসঙ্গে চিৎকার করা সুস্থ সংসদীয় চর্চা হতে পারে না।

নিজের দীর্ঘ ৪০ বছরের সংসদীয় অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন স্পিকার। অতীতের বিভিন্ন তিক্ত ঘটনার কথাও স্মরণ করেন তিনি। এমনকি অতীতে স্পিকারকে হত্যার মতো নির্মম ঘটনার কথাও তুলে ধরেন।

স্পিকার বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ সংসদ গড়ে তুলতে হবে।

বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যে স্পিকার বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যে কোনো অসংসদীয় শব্দ থাকলে তা পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় অংশ কার্যপ্রণালী থেকে বাদ দেওয়া হবে। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে কোনো পক্ষকে চাপ দেওয়ার উদ্দেশ্য তার নেই বলেও স্পষ্ট করেন তিনি।

স্পিকার সতর্ক করে বলেন, সংসদে একজনের বক্তব্য দেওয়ার সময় অন্য পক্ষকে তা শোনার মানসিকতা থাকতে হবে। বক্তব্য দেওয়া ও শোনার ক্ষেত্রে পরমতসহিষ্ণুতা না থাকলে দেশে গণতন্ত্র ব্যর্থ হবে।

এরপর আবার বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি অতীতে সংসদের কার্যপ্রণালী থেকে বক্তব্য বাদ দেওয়ার বিভিন্ন নজির তুলে ধরেন। তার দাবি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অসংসদীয় বক্তব্য স্পষ্ট এবং এ ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে।

সংসদ পরিচালনায় স্পিকারের ভূমিকার প্রতি সম্মান জানালেও ট্রেজারি বেঞ্চে সদস্য বেশি থাকার প্রসঙ্গে স্পিকারের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সংসদকে সংখ্যার ভিত্তিতে ভাগ করা উচিত নয়।

তিনি আরও বলেন, সরকার ভালো কাজ করলে বিরোধী দল সহযোগিতা করবে। অন্যায় হলে তার প্রতিবাদও করবে। সব সংসদ সদস্যকে সমান মর্যাদা দিয়ে সংসদ পরিচালনার জন্য স্পিকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য দিয়ে নিজের ক্ষোভের কথা জানান প্রবীণ সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী। বাজেট বক্তৃতায় একটি রূপক গল্প বলার কারণে তার বক্তব্যের কিছু অংশ কার্যপ্রণালী থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

কোন শব্দটি অসংসদীয় ছিল, স্পিকারের কাছে তা জানতে চান তিনি। নিজের দাড়ি ও ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে কটাক্ষ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন এই প্রবীণ সংসদ সদস্য।

তিনি বলেন, এ ধরনের মন্তব্য তার ব্যক্তিগত সম্মান ও সংসদের মর্যাদায় আঘাত করেছে। প্রবীণ সংসদ সদস্য হিসেবে নিজের সম্মান রক্ষার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বিষয়টির সুরাহা ও বিচার চেয়ে স্পিকারের কাছে আনুষ্ঠানিক নোটিশের জবাব চান।

সমাপনী বক্তব্যে স্পিকার বলেন, মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। তাই কার্যপ্রণালী পরীক্ষা করে বিষয়টি দেখা হবে। সেখানে কোনো অসংসদীয় বক্তব্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সবশেষে সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে কঠোর সতর্কবার্তা দেন স্পিকার। তিনি বলেন, যেভাবে সদস্যরা একে অপরের বক্তব্যে বাধা দিচ্ছেন, তা অত্যন্ত দুঃখজনক।

স্পিকার কোনো সদস্যকে বসতে বলার পরও তা না মানলে সংসদ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও সতর্ক করেন তিনি।

সংসদে চরম বিশৃঙ্খলার ঘটনায় হতাশা প্রকাশ করে সব পক্ষকে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান স্পিকার। পরে আসরের নামাজের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়।

Tagged:

Social Icons