২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান করছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রায় দুই বছর পর আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। তার এই ঘোষণাকে ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে ফিরতে না পারলে তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও আওয়ামী লীগের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও কৌতূহল রয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ডিসেম্বরের মধ্যে তার দেশে ফেরা কিংবা না ফেরা, দুই পরিস্থিতিরই বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব থাকতে পারে।
দেশে না ফিরলে নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনা যদি ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফিরতে না পারেন, তাহলে ১ জানুয়ারি থেকেই তার রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।
কারণ তিনি নিজেই ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে না ফিরলে পরবর্তীতে তার পক্ষ থেকে নতুন কোনো কারণ বা ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও সেটি দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের কাছে আগের মতো বিশ্বাসযোগ্যতা নাও পেতে পারে।
এতে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার নেতৃত্ব নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে এটি তার জন্য বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
দেশে ফিরলে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে
বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পথে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একটি মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত হয়েছেন।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম বলেছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বিমানবন্দরেই তাকে গ্রেফতার করা হবে এবং এরপর আদালতের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
তিনি আরও দাবি করেছেন, ট্রাইব্যুনাল আইনের বিধান অনুযায়ী রায়ের কপি পাওয়ার ৩০ দিন পর আপিলের সুযোগ থাকে এবং সেই সময়সীমা ইতোমধ্যে পার হয়ে গেছে।
দেশে ফেরার ঘোষণা কতটা বাস্তব?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলামের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হতে পারে। তার ধারণা, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে দলীয় নেতাকর্মীদের চাঙা রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তার মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাও তাকে মোকাবিলা করতে হবে।
অধ্যাপক আইনুল ইসলাম মনে করেন, ডিসেম্বরের মধ্যে তিনি দেশে না ফিরলে পরবর্তীতে ট্রাভেল পাস, বিমান অবতরণের অনুমতি কিংবা অন্য কোনো পরিস্থিতিকে কারণ হিসেবে সামনে আনা হতে পারে। কিন্তু এসব ব্যাখ্যা তার রাজনৈতিক অবস্থানের যে ক্ষতি হবে, তা পুরোপুরি পূরণ করতে পারবে না।
ফেরার সিদ্ধান্ত এখনো অনিশ্চিত
রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরা বা না ফেরার বিষয়টি এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত। তার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, এমনটা মনে করার যথেষ্ট কারণ নেই।
তবে তিনি দেশে ফিরলে রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তা দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে থাকা মামলার রায় এবং এর বাস্তবায়ন নিয়েও রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে পারে।
বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাও বড় চ্যালেঞ্জ
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার মতো অনুকূল পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। আওয়ামী লীগের কার্যক্রমও নিষিদ্ধ রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া শেখ হাসিনার প্রশ্নে সরকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির অবস্থানের মধ্যেও বড় ধরনের বিরোধ রয়েছে। ফলে দেশে ফিরলে তাকে শুধু আইনি প্রক্রিয়াই নয়, জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিও মোকাবিলা করতে হবে।
বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন। তার মতে, বর্তমান অবস্থায় শেখ হাসিনার দেশে ফিরে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন।
৩১ ডিসেম্বরের পর কী হবে?
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি আলোচনার বিষয়। তিনি সত্যিই দেশে ফিরলে এক ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশে না ফিরলে তার রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
তবে শেষ পর্যন্ত তিনি দেশে ফিরবেন কি না, কিংবা ডিসেম্বরের পর তার রাজনৈতিক অবস্থান কী হবে, তা নির্ভর করছে তার নিজস্ব সিদ্ধান্ত, আইনি পরিস্থিতি এবং দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতার ওপর।







