বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে—যা ঋণের সুদ কমিয়ে বিনিয়োগে গতি ফেরাতে চাইছে। তবে উদ্যোক্তাদের কাছে গ্যাস-বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা ও করব্যবস্থার অনিশ্চয়তাই বড় বাধা। ফলে সুদহার কমা কতটা বাস্তবে টান তৈরি করতে পারবে, সেটাই এখন মূল পরীক্ষা।
সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির ধাক্কা

কারখানা বন্ধ হওয়া, নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ কমে যাওয়া—সব মিলিয়ে বেসরকারি খাতে মন্দা কাটছে না। ব্যাংকগুলোও আগের মতো নতুন ঋণ ছাড়াতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী গত জুন শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে। এর আগে মে মাসে ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ, আর এপ্রিলে ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
ব্যাংকঋণ কম বৃদ্ধি মানে নতুন প্রকল্প, নতুন কর্মী নিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই গতি মন্থর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। প্রবাসীদের দেখা বাস্তবতাতেও এর প্রতিফলন মেলে—দেশের ভেতরে চাকরির সম্ভাবনা কমলে পরিবারের আয়-স্থিরতায় চাপ পড়ে।
ঋণ যাচ্ছে কোথায়
ঋণের যে অংশটি বিতরণ হচ্ছে, সেটার বড় একটি অংশ যাচ্ছে ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে। অর্থাৎ উৎপাদনমুখী বিনিয়োগের বদলে চলতি চাহিদা মেটানোই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। পাশাপাশি কিছু ভোক্তা ঋণও দেয়া হচ্ছে। ফলে কর্মসংস্থানে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে এমন নতুন বিনিয়োগে ঋণ প্রবাহ বাড়ছে না—এটাই উদ্বেগের জায়গা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগ
এই টানাপোড়েনের মধ্যে সরকারকে সহায়ক করে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার কমিয়েছে। দীর্ঘদিন উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের পর গত রোববার থেকে এটি কার্যকর হয়েছে। রেপো রেট বা নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ করা হয়েছে। এতে ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে অর্থ সংগ্রহের খরচ কিছুটা কমবে। ধীরে ধীরে ঋণের সুদও কমার সুযোগ তৈরি হতে পারে—এমন প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
সুদ কমলে বিনিয়োগের খরচ কমে আসে। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু সুদহার কমার সুবিধা নিতে হলে বাস্তব বাধাগুলো কমানো দরকার—এ কথা উদ্যোক্তাদের বক্তব্যেই বারবার উঠে আসে।
বাধা কোথায়
উদ্যোক্তারা গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অবকাঠামোগত অনিশ্চয়তাকে প্রধান প্রতিবন্ধকতা বলছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিনিয়োগে প্রভাব ফেলে বলে মনে করেন তারা। তাছাড়া করনীতি এবং ঘুষ-দুর্নীতির মতো পুরোনো সমস্যাগুলোর কথাও উঠে এসেছে।
অর্থাৎ শুধু সুদের হার নয়—ব্যবসা করার পরিবেশই নির্ধারণ করছে ঋণ নিয়ে উৎপাদনে নামার সাহস কতটা তৈরি হচ্ছে। অতীতে বেনামে ঋণ চলে যাওয়ার অভিজ্ঞতাও আছে, যেখানে বিনিয়োগে সুফল কম মিলেছে। তাই ব্যাংকগুলো এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক থাকলে সুদহার কমলেও প্রভাব সীমিত হতে পারে।
প্রবাসীদের জন্য বার্তা
প্রবাসীরা সাধারণত পরিবারকে ভরন-পোষণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় সহায়তা দিতে দেশে অর্থ পাঠান। যখন দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান কমে, তখন পরিবারগুলোর চাপ বাড়ে। ঋণ প্রবাহ ঠিকমতো বিনিয়োগে রূপ না নিলে এই চাপই দীর্ঘ হয়। তাই নীতি সুদহার কমানো উদ্যোগটি বাস্তবে কতটা উৎপাদনমুখী ঋণে গতি দেয়—সেটিই প্রবাসী পরিবারগুলোর কাছেও গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষেপে—কী দেখবেন এখন
বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়তে হলে দেখতে হবে ঋণ কোন খাতে যাচ্ছে। আমদানি ও ভোগ্যপণ্যনির্ভরতা কমে উৎপাদনমুখী খাতে ঋণ বাড়ে কি না—এটাই হবে সবচেয়ে পরিষ্কার সূচক। পাশাপাশি সুদহার কমার পর ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে বাস্তব পরিবর্তন আসে কি না সেটিও পর্যবেক্ষণের বিষয়।
প্রশ্ন: নীতি সুদহার কমলে কি ঋণের সুদ কমবে নিশ্চিতভাবে?
উত্তর: সুযোগ তৈরি হয়—তবে বাস্তব বাধা ও ব্যাংকের সতর্কতা থাকলে প্রভাব পুরোটা নাও পৌঁছাতে পারে।
প্রশ্ন: বর্তমান সময়ে ঋণ বেশি যাচ্ছে কোন খাতে?
উত্তর: ভোগ্যপণ্য ও কাঁচামাল আমদানিসহ কিছু ভোক্তা ঋণে বেশি জোর দেখা যাচ্ছে।
প্রশ্ন: বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে মূল শর্ত কী?
উত্তর: সুদ কমার পাশাপাশি গ্যাস-বিদ্যুৎ, আইনশৃঙ্খলা ও করব্যবস্থার বাধা কমাতে হবে।
আরও পড়ুন: এই বিভাগের সর্বশেষ খবর
সূত্র: prothomalo.com









