GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / আজকের খবর / বাংলাদেশের ইলিশ গেল কোথায়?

বাংলাদেশের ইলিশ গেল কোথায়?

পটুয়াখালীর কলাপাড়ার নীলগঞ্জের জেলে সিদ্দিক মাঝি তিন দশকের বেশি সময় ধরে সাগরে মাছ ধরছেন। তার অভিজ্ঞতায়, গত সাত-আট বছরে ধীরে ধীরে ইলিশের পরিমাণ কমেছে। একসময় নদীর মোহনা ও উপকূলের অগভীর পানিতে সহজেই বড় ইলিশ পাওয়া গেলেও এখন সেখানে মাছ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

সিদ্দিক বলেন, গভীর সাগরে এখনো প্রচুর ইলিশ রয়েছে, তবে সেগুলো আগের মতো অগভীর পানিতে আসে না। তার প্রশ্ন, মাছগুলো এখন আর ২০ থেকে ৪০ ফুট গভীর পানির স্তরে থাকতে চায় না কেন।

দেশের ইলিশ উৎপাদনের পরিসংখ্যানেও সাম্প্রতিক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন প্রায় পাঁচ লাখ ৭১ হাজার টনে পৌঁছেছিল। পরের দুই বছরে উৎপাদন প্রায় ১২ দশমিক পাঁচ শতাংশ কমে যায়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের আহরণ নেমে আসে প্রায় পাঁচ লাখ টনে, যা সাত বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এ ছাড়া ২০২৫ সালের জুলাই ও আগস্টে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ইলিশের আহরণ প্রায় ৪৫ শতাংশ কমে যায় বলে জানা গেছে।

ইলিশ কি সাগরের আরও গভীরে চলে যাচ্ছে?

জেলেদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ইলিশ ধরার স্থান ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। সিদ্দিক জানান, নদীর মোহনা থেকে ২০, ৩০ বা ৪০ কিলোমিটারের মধ্যে আগে প্রচুর ইলিশ পাওয়া গেলেও এখন সেখানে বড় মাছের দেখা কম।

উপকূল থেকে আরও দূরে, বিশেষ করে ৪০ মিটারের বেশি গভীর পানিতে এখনো প্রচুর ইলিশ পাওয়া যায় বলে জানান তিনি। তবে প্রান্তিক জেলেদের অনেকের পক্ষে এত দূরে গিয়ে মাছ ধরা সম্ভব নয়। তাদের নৌকা ও জাল মূলত অগভীর পানিতে মাছ ধরার উপযোগী।

এর প্রভাব সরাসরি জেলেদের আয়ে পড়ছে। পটুয়াখালীর জেলে আবুল হোসেন ইলিশের ভরা মৌসুমে ১৪ দিন সাগরে কাটিয়েও মাত্র তিন হাজার টাকা নিয়ে ফিরেছেন। অথচ আগের বছর একই সময়ে তার আয় ছিল প্রায় এক লাখ টাকা

ভাগে মাছ ধরা জেলেদের জন্য মাছ কম পাওয়া আরও বড় সংকট তৈরি করে। নৌকার মালিকেরা জাল, বরফ ও খাবারের খরচ বহন করেন। মাছ বিক্রির আয় থেকে এসব খরচ বাদ দেওয়ার পর বাকি অর্থ জেলেদের মধ্যে ভাগ হয়। ফলে মাছের পরিমাণ কমে গেলে আয় কমার পাশাপাশি ঋণের চাপও বাড়তে পারে।

উজানেও বদলে যাচ্ছে ইলিশের চিত্র

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও মৎস্যবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ড. ইয়ামিন হোসেন ২০১৭ সাল থেকে পদ্মায় ইলিশ নিয়ে গবেষণা করছেন।

তার গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২২ সাল পর্যন্ত অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে পাওয়া অধিকাংশ ইলিশের ওজন ছিল ৩০০ গ্রামের কম। ৬০০ থেকে ৭০০টি ইলিশের নমুনায় ৩০০ গ্রামের বেশি ওজনের মাছ পাওয়া যেত খুব কম।

ড. ইয়ামিন হোসেন বলেন, বড় আকারের ইলিশের উজানে উঠে আসার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, ইলিশ তুলনামূলক ছোট আকারেই প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে উঠছে। সাধারণত প্রজননক্ষম ইলিশের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ সেন্টিমিটার হলেও পদ্মায় ১৭ থেকে ১৮ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য এবং ১৪০ থেকে ১৫০ গ্রাম ওজনের প্রাপ্তবয়স্ক ইলিশ পাওয়া গেছে।

তবে ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে মাছটির সামগ্রিক সংখ্যা কমে গেছে।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য জীববিজ্ঞান ও জেনেটিকস বিভাগের অধ্যাপক ড. শামসুল আলম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে ইলিশের জিনগত বৈচিত্র্য বা সংখ্যায় ধস নেমেছে, এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তার মতে, জিনগত তথ্য বরং ইলিশের সংখ্যা বাড়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে। তিনি বলেন, ইলিশের ওপর কোনো নেতিবাচক জিনগত প্রভাব পাওয়া যায়নি

ইলিশ সাগর, মোহনা ও মিঠাপানিতে বসবাস করতে পারে। ড. শামসুল আলমের ধারণা, সাগরের আরও গভীরে ইলিশের উপস্থিতি বাড়ার বিষয়টি আচরণগত অভিযোজনের ফল হতে পারে।

ইলিশের অভিবাসনপথে বাড়ছে চাপ

প্রজননের জন্য ইলিশ সাগর থেকে মিঠাপানির দিকে আসে। তাই নদীর পরিবেশ ও পানিপ্রবাহ তাদের জীবনচক্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকদের মতে, নদীতে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া ও পলি জমা ইলিশের চলাচলে বড় সমস্যা তৈরি করছে।

ড. শামসুল আলম ফারাক্কা বাঁধের কারণে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং নদীতে চর জেগে ওঠার বিষয়টি তুলে ধরেছেন। অন্যদিকে ড. ইয়ামিন হোসেন বাংলাদেশের নদীগুলোতে ব্যাপক পলি জমার কথা উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোতে দ্রুত ড্রেজিংয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

মৎস্য অধিদপ্তরের এক জরিপে মেঘনা-তেঁতুলিয়া মোহনা ও আশপাশের নদীগুলোতে ইলিশের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে এমন ১৭টি স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি মেঘনা নদীতে

ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের জন্য প্রায় ৩০ ফুট গভীর পানি প্রয়োজন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু ভাটার সময় মোহনার কিছু এলাকায় পানির গভীরতা মাত্র আট থেকে নয় ফুটে নেমে আসে।

এর সঙ্গে রয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। বৃষ্টিপাত, মিঠাপানির প্রবাহ, পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা ও স্রোতের সঙ্গে ইলিশের প্রজনন ও চলাচল ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। ফলে মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন ও বঙ্গোপসাগরের তাপমাত্রায় পরিবর্তন ইলিশের চলাচলেও প্রভাব ফেলতে পারে।

উপকূলীয় আবাসস্থলও চাপের মুখে। বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বা বাদাবন-সংলগ্ন এলাকায় ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা, কীটনাশক ও বিষের ব্যবহার ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার স্থানকে হুমকির মুখে ফেলছে।

সংরক্ষণে সাফল্য থাকলেও সমস্যা রয়ে গেছে

ইলিশ রক্ষায় বাংলাদেশে জাটকা ধরা নিষিদ্ধ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এবং সাগরে নির্দিষ্ট সময় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মা ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞার ফলে বিপুলসংখ্যক প্রজননক্ষম মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পায়।

তবে জেলেদের অভিযোগ, এসব নিষেধাজ্ঞা সব এলাকায় সমানভাবে কার্যকর হচ্ছে না।

সিদ্দিক মাঝি জানান, কুয়াকাটা, পটুয়াখালী ও বরগুনা এলাকার জেলেরা সাধারণত সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা মেনে চলেন। তবে অন্য এলাকার কিছু নৌকা তখনো মাছ ধরে।

নিষেধাজ্ঞার সময়ে জেলেদের দেওয়া ক্ষতিপূরণ নিয়েও সমস্যা রয়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া জেলেদের মতে, এই সহায়তা পর্যাপ্ত নয় এবং প্রকৃত জেলেরা সবসময় তা পান না।

ইলিশ কি আবার ফিরতে পারে?

ইলিশের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদের কারণও রয়েছে। আগের ইলিশ মৎস্য ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনায় দেখা গেছে, লক্ষ্যভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রমের মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন, মাছের আকার ও জেলেদের আয় বাড়ানো সম্ভব

ড. ইয়ামিন হোসেনের মতে, জাটকা রক্ষা এবং প্রজননক্ষম মা ইলিশকে নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ দেওয়া গেলে ২০২৮-২৯ সালের মধ্যে ইলিশের প্রাচুর্য আবার বাড়তে শুরু করতে পারে

তবে ইলিশ পুনরুদ্ধারে প্রতিবছর কয়েক সপ্তাহ মাছ ধরা বন্ধ রাখাই যথেষ্ট নয়। নদীর পানিপ্রবাহ ও ইলিশের চলাচলের পথ পুনরুদ্ধার, উপকূলীয় বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র সুরক্ষা, ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরা বন্ধ, সব এলাকায় সমানভাবে আইন প্রয়োগ এবং প্রকৃত জেলেদের কাছে ক্ষতিপূরণ পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

এর পাশাপাশি ইলিশ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছেন গবেষকেরা।

ড. শামসুল আলম বলেন, ‘ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ এবং এত গুরুত্বপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও এটি নিয়ে আসলে গবেষণা খুবই কম হয়েছে।’

Social Icons