GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / প্রথম পাতা / টাকা গেল, কপ্টার এলো না রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে বড় প্রশ্ন

টাকা গেল, কপ্টার এলো না রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তিতে বড় প্রশ্ন

পুলিশবাহিনীর জন্য রাশিয়া থেকে ৫৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে কেনা দুটি হেলিকপ্টারের একটিও এখন পর্যন্ত হাতে পায়নি বাংলাদেশ। চুক্তির আওতায় তিন অর্থবছরে প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হলেও রুশ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে হেলিকপ্টার গ্রহণ করা হয়নি। ফলে অর্থ পরিশোধের পরও পণ্য না পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, জি-টু-জি পদ্ধতিতে এই দুটি হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি হয়েছিল। এর মধ্যস্থতাকারীকে প্রায় ১৭ কোটি টাকা কমিশনও দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

৫৫৬ কোটি টাকার হেলিকপ্টার কেনার চুক্তি

২০২১ সালের ১৯ নভেম্বর রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান জেএসসি হেলিকপ্টার্স থেকে ‘এমআই১৭১এ২’ মডেলের দুটি হেলিকপ্টার কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকার চুক্তি করে।

দরপত্র ছাড়াই জি-টু-জি পদ্ধতিতে করা ওই চুক্তির মোট মূল্য ধরা হয় ৫৫৬ কোটি টাকা।

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিন অর্থবছরে হেলিকপ্টারের মূল্যের ৭০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

তবে চুক্তির পরপরই রুশ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি সামনে আসে।

নিষেধাজ্ঞার পরও অর্থ পরিশোধ

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সংশ্লিষ্ট কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দেয় ২০২২ সালের প্রথমদিকে। এরপরও ২০২৪ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে হেলিকপ্টারের মূল্য পরিশোধ করেছে বাংলাদেশ।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানানো হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে নড়াচড়া শুরু হয়।

মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার কাছ থেকে হেলিকপ্টার আপাতত গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

একটি হেলিকপ্টার প্রস্তুতও করেছিল রাশিয়া

চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে হেলিকপ্টার দুটি সরবরাহ করার কথা ছিল।

সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি হেলিকপ্টার ২০২৪ সালের এপ্রিলে দেওয়ার কথা ছিল। পরে রাশিয়া ২০২৫ সালের ১৭ জানুয়ারি সরবরাহের জন্য একটি হেলিকপ্টার প্রস্তুতও করে।

তবে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে শেষ পর্যন্ত সেটিও গ্রহণ করেনি বাংলাদেশ।

কবে নিষেধাজ্ঞা উঠবে এবং কবে হেলিকপ্টার দুটি পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো সময়সীমা নেই।

রাশিয়ায় গিয়েছিলেন ৮ কর্মকর্তা

২০২৪ সালের ১৫ থেকে ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত আটজন কর্মকর্তা রাশিয়া সফর করেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল প্রিশিপমেন্ট ইন্সপেকশন বা চালান পাঠানোর আগে হেলিকপ্টার দুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা।

পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তাদের রাশিয়ায় যেতে হয়েছিল। এটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তি হওয়ায় নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই পরিদর্শন করতে হয়েছে বলে তিনি জানান।

তবে নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি সামনে আসার পর হেলিকপ্টার গ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

মধ্যস্থতাকারীকে ১৭ কোটি টাকা কমিশন

জি-টু-জি পদ্ধতিতে চুক্তি হলেও এর মধ্যস্থতাকারী সৈয়দ আহসান আহমেদ সায়মুমকে ক্রয়মূল্যের ওপর ৪ শতাংশ হারে প্রায় ১৭ কোটি ১২ লাখ টাকা কমিশন দেওয়া হয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, সায়মুম তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের ক্যাশিয়ার ছিলেন।

তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

কেন নিষেধাজ্ঞার পরও চুক্তি এগোল?

সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার মতে, রুশ প্রতিষ্ঠানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের পরই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়টি বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল।

তাদের প্রশ্ন, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পরও কেন ২০২৪ সাল পর্যন্ত অর্থ পরিশোধ করা হলো এবং কেন পরবর্তীতে হেলিকপ্টার পরীক্ষা করতে কর্মকর্তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হলো।

একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, পুরো প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বা দুর্নীতির বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ

পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের এক কর্মকর্তা বলেন, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে রাশিয়ার কাছ থেকে হেলিকপ্টার গ্রহণ করলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে প্রভাব পড়তে পারে।

এ কারণেই আপাতত হেলিকপ্টার গ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিষয়টি নিয়ে কর্মকর্তাদের ভিন্ন অবস্থান

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মঞ্জুর মোর্শেদ চৌধুরী বলেন, রাশিয়া থেকে পুলিশ বাহিনীর জন্য তিনি কোনো হেলিকপ্টার কেনেননি এবং যারা কিনেছেন তাদের কাছে বিষয়টি জানতে হবে।

মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আবু নঈমও জানান, বর্তমান দায়িত্বে তিনি মাত্র ২৪ দিন কাজ করছেন এবং হেলিকপ্টার কেনার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না।

অন্যদিকে, কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, ২০২১ সালে চুক্তিটি হওয়ায় বর্তমান দায়িত্বশীলদের কেউ তখন ওই পদে ছিলেন না। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে নানা প্রশ্ন থাকলেও কেউ প্রকাশ্যে বিস্তারিত কথা বলতে চাইছেন না।

জাতীয় স্বার্থে ক্ষতির অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, ব্যক্তিস্বার্থের কারণে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। তারা মনে করছেন, হেলিকপ্টার কেনার পুরো প্রক্রিয়া, নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি জানার পরও অর্থ পরিশোধ, মধ্যস্থতাকারীর কমিশন এবং পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলো তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিষয়টি অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্টদের জানানো হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

সব মিলিয়ে প্রায় ৪২৮ কোটি টাকা পরিশোধের পরও বাংলাদেশ হেলিকপ্টার না পাওয়ায় এখন চুক্তিটির ভবিষ্যৎ, পরিশোধ করা অর্থ এবং দায় নির্ধারণ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

Social Icons