ইলিশের তীব্র সংকটে জৌলুস হারাচ্ছে চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী বড় স্টেশন মাছঘাট। একসময় যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মণ মাছ বিক্রি হতো, সেখানে এখন ইলিশের সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ক্রমাগত লোকসানের কারণে বেশিরভাগ আড়তদার প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে পড়েছেন। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত থাকা শত শত শ্রমিকও হারিয়েছেন কর্মসংস্থান।
ইলিশের পর্যাপ্ত সরবরাহ ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে ব্রিটিশ আমলে ডাকাতিয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠে চাঁদপুর শহরের বড় স্টেশন মাছঘাট। এই ঘাট থেকেই সারা দেশে পৌঁছে যেত রুপালি ইলিশ। ইলিশের মৌসুমে একসময় এখানে প্রায় হাজার কোটি টাকার মাছ বিক্রি হতো।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ঘাটে ইলিশের সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমেছে। মাছের সংকটের কারণে দামও বেড়েছে। এতে আড়তদারদের পাশাপাশি বাজারকে ঘিরে গড়ে ওঠা অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও লোকসানে পড়েছে। ঐতিহ্যবাহী এই মাছবাজার এখন অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে।
ঘাটে আসা ক্রেতা শহিদুল ইসলাম বলেন, এখন ইলিশের ভরা মৌসুম হলেও তুলনামূলকভাবে মাছ অনেক কম। ফলে দামও অনেক বেশি। এ কারণে তিনি মাছ না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
আরেক ক্রেতা কেএম সালাউদ্দিন বলেন, ১৫ দিন আগেও ঘাটে এসে মাছের দাম বেশি পেয়েছিলেন। তখন বিক্রেতারা দাম কমার কথা বললেও এখনো দাম কমেনি। মাছের দাম মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য কষ্টকর বলেও জানান তিনি।
ইলিশের আড়তদার সম্রাট বেপারী বলেন, ভরা মৌসুমের তুলনায় মাছ অনেক কম। সরবরাহ কম থাকায় দামও বেশি। ইলিশ রক্ষায় অবৈধ জাল বন্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ইলিশ বিক্রেতা মাসুম বেপারী বলেন, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ইলিশের সরবরাহ একেবারেই কম। ছোট ইলিশ নিধন বন্ধে ইলিশ রক্ষা অভিযান যথাযথভাবে পরিচালনার দাবি জানান তিনি।
ইলিশ ব্যবসায়ী শাহাবুদ্দিন বলেন, নদীতে ইলিশ প্রায় নেই বললেই চলে। অল্প পরিমাণ মাছ ঘাটে আসায় দাম বেড়েছে। তিনি নদীর ডুবোচর খনন, অবৈধ কারেন্ট জালের কারখানা বন্ধ এবং ইলিশ রক্ষা অভিযান কঠোরভাবে পরিচালনার দাবি জানান।
চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাজী শবেবরাত সরকার বলেন, ইলিশের মূল মৌসুম হলেও এখন মাছ নেই বললেই চলে। তার মতে, নদীদূষণ, ডুবোচর ও নাব্য সংকটের কারণে ইলিশের সরবরাহ কমেছে। পাশাপাশি ইলিশ রক্ষা অভিযানের সময় অসাধু জেলেদের মাছ ধরার বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মির্জা ওমর ফারুক বলেন, গত বছর কঠোরভাবে ইলিশ রক্ষা অভিযান পরিচালনা করা হয়েছিল এবং অভিযান সফল হয়েছে। এবারও সামনে ইলিশ রক্ষার অভিযান পরিচালনা করা হবে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, প্রাকৃতিক কারণ, বন্যা ও বৃষ্টি না হওয়ায় আগের মতো ইলিশ ধরা পড়ছে না। এর পাশাপাশি নদীর নাব্য সংকট, ডুবোচর ও নদীদূষণ ইলিশের ওপর প্রভাব ফেলছে।
তিনি জানান, নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনা, দূষণমুক্ত করা এবং ডুবোচর দূর করতে চাঁদপুরে একটি টেকনিক্যাল টিম ইতোমধ্যে পরিদর্শন করেছে। দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরও জানান, আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে মা ইলিশ রক্ষার অভিযান শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এ অভিযান নিয়ে মৎস্য বিভাগ উদ্বিগ্ন। কারণ ইলিশ রক্ষার একটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও নতুন করে তা বাড়ানো হয়নি।
তিনি বলেন, ওই প্রকল্পের বাজেট দিয়ে ইলিশ রক্ষার কার্যক্রম পরিচালনা করা হতো। প্রকল্প বন্ধ হওয়ায় রাজস্ব খাত থেকে প্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি মৎস্য বিভাগের প্রয়োজনীয় জনবলও কম। ইলিশ রক্ষা অভিযান পরিচালনার জন্য স্পিডবোটের চালকও নেই। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
