পৃথিবীর কক্ষপথে মহাকাশ অস্ত্র মোতায়েনের কথা প্রথমবারের মতো স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শত্রুপক্ষের হামলা থেকে মার্কিন বাহিনীকে সুরক্ষিত রাখতে এই অস্ত্র প্রয়োজনীয় ছিল। তবে অস্ত্রটির সক্ষমতা বা ঠিক কখন এটি কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) এয়ার, স্পেস অ্যান্ড সাইবার সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার ফোর্সের সচিব ট্রয় মেইঙ্ক বলেন, পরিবর্তনশীল হুমকি মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত রয়েছে।
এর এক দিন পর মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় চীন মহাকাশে ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’ শুরু করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে।
এএফপির বরাত দিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উচিত সামরিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং মহাকাশে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া বন্ধ করা।
তবে মোতায়েন করা অস্ত্রটি কীভাবে কাজ করে, সে বিষয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের এক মুখপাত্র জানান, স্পেস কন্ট্রোলের আওতায় মহাকাশে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম রয়েছে। এর মাধ্যমে গতিশীল ও অগতিশীল বা kinetic ও non-kinetic পদ্ধতিতে প্রতিপক্ষের সক্ষমতায় বিঘ্ন ঘটানো, দুর্বল করা এবং প্রয়োজনে ধ্বংস করাও সম্ভব।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধরত কমান্ডগুলোর নির্দেশে এসব সক্ষমতা আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক উভয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যেতে পারে।
মহাকাশের সামরিক ব্যবহারের বিষয়ে রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (RUSI) ড. ব্লেডিন বাওয়েন বলেন, এই প্রযুক্তি সম্পর্কে জনসমক্ষে প্রকাশিত তথ্য খুবই সামান্য। তার ধারণা, এর মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রব্যবস্থা থাকতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যুদ্ধ বা রেডিও জ্যামিং প্ল্যাটফর্মের কথা বলছে। এ ধরনের অস্ত্র রেডিও যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এবং পৃথিবীতেও এমন প্রযুক্তি আগে থেকেই রয়েছে।
আরেকটি সম্ভাবনা হিসেবে তিনি ‘কাইনেটিক কিল ভেহিকল’-এর কথা উল্লেখ করেন। এ ধরনের যান কোনো প্রজেক্টাইল ছুড়ে সেটিকে স্যাটেলাইটের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটিয়ে ধ্বংস করতে পারে। তবে বাওয়েনের মতে, এই সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম, কারণ সরাসরি ধ্বংসাত্মক অস্ত্র মহাকাশে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য আকাশপথের হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সুরক্ষিত রাখতে পরিকল্পিত ‘গোল্ডেন ডোম’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মহাকাশভিত্তিক সক্ষমতা ও ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গত বছর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন। এতে মার্কিন সম্পদ সুরক্ষার পাশাপাশি আক্রমণাত্মক বাহিনী হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
২০১৯ সালে ইউএস স্পেস ফোর্স প্রতিষ্ঠা করা হয়। ৭০ বছরেরও বেশি সময় পর এটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর প্রথম নতুন শাখা। মহাকাশে থাকা মার্কিন সম্পদ, বিশেষ করে যোগাযোগ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত শত শত স্যাটেলাইট সুরক্ষার উদ্দেশ্যে এটি গঠন করা হয়।
১৯৬৭ সালের একটি চুক্তিতে কক্ষপথে গণবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন নিষিদ্ধ করা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনসহ প্রধান শক্তিগুলো ওই চুক্তির আওতার বাইরে বিভিন্ন সামরিক সক্ষমতা নিয়ে কাজ করে আসছে। এর মধ্যে প্রতিপক্ষের স্যাটেলাইটকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর সক্ষমতাও রয়েছে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছিল, রাশিয়া এমন একটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে, যেটি অন্য স্যাটেলাইটকে আক্রমণ করার সক্ষমতা রাখে বলে তারা মনে করে। এ বিষয়ে রাশিয়া প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের ভাষ্য অনুযায়ী, চীন মহাকাশ ও কাউন্টারস্পেস সক্ষমতা তৈরি ও পরিচালনা করছে। একইভাবে রাশিয়া মহাকাশকে যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচনা করে এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতে মহাকাশে শ্রেষ্ঠত্বকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে।

