গত কয়েকদিনে দেশে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। এতে আবাসিক, সিএনজি ও শিল্প খাতের গ্রাহকদের ভোগান্তি আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের চাপ বাড়ায় রান্না ও শিল্পকারখানার কাজে স্বস্তি ফিরেছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের জন্য অপেক্ষার সময় কমেছে।
তবে সরবরাহ বাড়লেও গ্যাস সংকট পুরোপুরি কাটেনি। চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকায় এখনো বিভিন্ন এলাকায় কম চাপ ও নির্দিষ্ট সময়ে গ্যাস না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সিএনজি ও আবাসিকে কিছুটা স্বস্তি
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, আগের তুলনায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে ভিড় কমেছে। আগে যেখানে গ্যাস নিতে দুই থেকে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হতো, এখন অনেক জায়গায় ঘণ্টাখানেক বা তারও কম সময়ে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
মিরপুরের বাসিন্দা আকলিমা জানান, গত দুই দিন ধরে তিনি গ্যাস পাচ্ছেন এবং রান্না করতে পারছেন। এর আগে কয়েকদিন রান্না করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।
আজিমপুরের বাসিন্দা জান্নাতী সুলতানাও জানান, গত দুই দিন ধরে কিছুটা গ্যাস পাওয়ায় রান্নার কাজ মোটামুটি করা যাচ্ছে।
শাহবাগের সিএনজি অটোরিকশাচালক ইয়ার আলী বলেন, আগে তিন ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে হতো। এখন অপেক্ষার সময় কমেছে এবং গ্যাসের চাপও কিছুটা বেড়েছে।
শিল্পেও বেড়েছে সরবরাহ
গ্যাসের সরবরাহ বাড়ায় শিল্পকারখানাতেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, উৎপাদন কার্যক্রম আগের তুলনায় স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে নেওয়া যাচ্ছে।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান জানান, গত কয়েক দিনের তুলনায় গ্যাস পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এবং সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় ডাইং, ওয়াশিংসহ ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতের কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছিল।
৪ দিনে সরবরাহ বেড়েছে ২৬১ মিলিয়ন ঘনফুট
পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর থেকে ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে দৈনিক গ্যাস সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ২৬০ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)।
১৩-১৪ সেপ্টেম্বর মোট গ্যাস উৎপাদন ও আরএলএনজি সরবরাহ ছিল ২ হাজার ৩৪৫ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি। ১৪-১৫ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে হয় ২ হাজার ৪৭৮ দশমিক ১ এমএমসিএফডি। ১৫-১৬ সেপ্টেম্বর সরবরাহ দাঁড়ায় ২ হাজার ৬০৪ এমএমসিএফডি। সর্বশেষ ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ এমএমসিএফডি।
অর্থাৎ চার দিনে দৈনিক সরবরাহ বেড়েছে প্রায় ১১ দশমিক ১ শতাংশ।
বৃদ্ধির প্রধান উৎস এলএনজি
সরবরাহ বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে এলএনজি থেকে। ১৩-১৪ সেপ্টেম্বর আরএলএনজি থেকে সরবরাহ ছিল ৭৩১ দশমিক ৬ এমএমসিএফডি। ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৮২ দশমিক ৯ এমএমসিএফডি।
চার দিনে এলএনজি থেকে সরবরাহ বেড়েছে ২৫১ দশমিক ৩ এমএমসিএফডি, যা মোট সরবরাহ বৃদ্ধির প্রায় ৯৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, স্থানীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন একই সময়ে ১ হাজার ৬১৩ দশমিক ৭ এমএমসিএফডি থেকে বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৬২৩ দশমিক ২ এমএমসিএফডি। অর্থাৎ স্থানীয় উৎপাদন বেড়েছে মাত্র ৯ দশমিক ৫ এমএমসিএফডি।
সক্ষমতার তুলনায় এখনো ঘাটতি
পেট্রোবাংলার সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেশের মোট গ্যাস উৎপাদন ও সরবরাহ সক্ষমতা ৩ হাজার ৮৫৪ এমএমসিএফডি দেখানো হয়েছে। এর বিপরীতে ১৬-১৭ সেপ্টেম্বর সরবরাহ হয়েছে ২ হাজার ৬০৬ দশমিক ১ এমএমসিএফডি।
অর্থাৎ মোট সক্ষমতার প্রায় ৬৭ দশমিক ৬ শতাংশ ব্যবহার হয়েছে। চার দিন আগে এই হার ছিল ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ।
যা বলছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অবৈতনিক অধ্যাপক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাস সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি বিদেশি কোম্পানিগুলোকেও কাজে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। তার মতে, দেশীয় সম্পদকে কাজে লাগানো গেলে গ্যাস সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
