GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / জাতীয় / বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে ০.৫% ছাড়, খরচ নিয়ন্ত্রণে যেসব সুবিধা

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটারে ০.৫% ছাড়, খরচ নিয়ন্ত্রণে যেসব সুবিধা

বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের রিচার্জ করা অর্থের অবশিষ্ট অংশের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট দিচ্ছে সরকার। এ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব জানা, প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করা এবং মাসিক ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানো সম্ভব।

প্রিপেইড মিটারে রিচার্জের পর অবশিষ্ট ব্যালেন্স এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ সহজেই জানা যায়। ফলে গ্রাহক নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী রিচার্জ করতে পারেন এবং খরচের ওপর নজর রাখতে পারেন। অন্যদিকে পোস্টপেইড মিটারে সাধারণত মাস শেষে বিলের পরিমাণ জানা যায়। তাই আগে থেকে বিদ্যুৎ ব্যয়ের হিসাব রাখা তুলনামূলক কঠিন হতে পারে।

প্রিপেইড মিটারের উল্লেখযোগ্য সুবিধা

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড মিটারে অগ্রিম রাজস্ব আদায়, সিস্টেম লস কমানো, ওভারলোড নিয়ন্ত্রণ, লোড ব্যবস্থাপনা এবং বিলিংয়ের নির্ভুলতা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এ ব্যবস্থায় মিটার রিডিং নেওয়া, বিল তৈরি ও বিতরণে জনবল ব্যয়ও কমতে পারে।

এ ছাড়া জরুরি ব্যালেন্স, ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ার’ এবং সাপ্তাহিক ও সরকারি ছুটির দিনেও বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুবিধা রয়েছে। ভাড়াটিয়া ও সরকারি আবাসনের বিলিংসংক্রান্ত জটিলতা কমাতেও প্রিপেইড মিটার ভূমিকা রাখছে।

মোবাইল ব্যাংকিং, ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে যেকোনো সময় মিটারে রিচার্জ করা যায়। পাশাপাশি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার ভেন্ডিং স্টেশন, পিওএস এজেন্ট এবং ব্যাংকের বুথ থেকেও রিচার্জের সুযোগ রয়েছে। মিটারের ব্যালেন্স কমে গেলে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়। নির্ধারিত ‘ফ্রেন্ডলি আওয়ারে’ ব্যালেন্স শেষ হলেও জরুরি ক্রেডিট সুবিধায় সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা সম্ভব।

গ্রাহকদের অভিজ্ঞতা কী বলছে?

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা জানিয়েছেন, এ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ খরচ সম্পর্কে আগে থেকেই ধারণা পাওয়া যায়। ব্যালেন্স পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হওয়ায় মাস শেষে বড় অঙ্কের বিল নিয়ে অনিশ্চয়তাও কমে।

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা সালেহ হাসান বাসসকে বলেন, মাসের শুরুতে কত টাকা রিচার্জ করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে তিনি বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিকল্পনা করেন। ঘরে বসেই মিটার রিচার্জ করা যায় এবং অবশিষ্ট ব্যালেন্সও জানা যায়। এতে প্রয়োজন ছাড়া বিদ্যুৎ ব্যবহার না করার বিষয়ে সচেতনতা বেড়েছে।

বগুড়া শহরের নেসকোর গ্রাহক মুজাহিদ শেখ জানান, কিছুদিন আগে তার বাসায় প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে। আগে মাস শেষে কত টাকা বিল আসবে, তা জানা যেত না। এখন পরিকল্পনা অনুযায়ী রিচার্জ করতে পারছেন এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বেশি সচেতন হয়েছেন।

তার মতে, প্রিপেইড ও পোস্টপেইড মিটারে বিদ্যুতের মূল খরচ একই হলেও সচেতনভাবে ব্যবহার করলে প্রিপেইড মিটারে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

প্রিপেইড মিটারে কী কী চার্জ দিতে হয়?

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, প্রিপেইড সংযোগ নিতে কোনো নিরাপত্তা জামানত দিতে হয় না। আবাসিক গ্রাহকের অনুমোদিত লোডের প্রতি কিলোওয়াটের জন্য মাসে ৪২ টাকা ডিমান্ড চার্জ এবং ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য।

বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার সরবরাহ করা মিটারের ক্ষেত্রে সিঙ্গেল ফেজ মিটারের মাসিক ভাড়া ৪০ টাকা এবং থ্রি ফেজ মিটারের ভাড়া ২৫০ টাকা। মাসের প্রথম রিচার্জের সময় ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া সমন্বয় করা হয়। এরপর অবশিষ্ট অর্থের ওপর শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ রিবেট যোগ হয়।

উদাহরণ হিসেবে, ২ কিলোওয়াট অনুমোদিত লোডের একজন আবাসিক গ্রাহক জানুয়ারিতে প্রথমবার ১ হাজার টাকা রিচার্জ করলে ভ্যাট, ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া বাবদ ১৭১ টাকা ৬২ পয়সা কাটা হবে। এরপর রিবেট যোগ হয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য মিটারে ৮৩২ টাকা ৫২ পয়সা জমা থাকবে।

মিটারে আগের মাসের কোনো ব্যালেন্স অবশিষ্ট থাকলে পরবর্তী মাসে নতুন করে রিচার্জ না করেও সেই অর্থ দিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা যায়। তবে কোনো মাসে রিচার্জ না করলে ওই মাসের এবং আগের মাসগুলোর প্রযোজ্য ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়া পরবর্তী রিচার্জের সময় সমন্বয় করা হয়।

গ্রাহকদের সচেতনতা বাড়ানোর পরামর্শ

ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) লিড এনার্জি অ্যানালিস্ট শফিকুল আলম বাসসকে বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে গ্রাহকদের উদ্বেগ ও সমস্যা কমাতে এবং এ ব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করতে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

তিনি জানান, উদাহরণ হিসেবে ডেসকোর অ্যাপে মিটারের অবশিষ্ট ব্যালেন্স ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণসহ বিভিন্ন তথ্য দেখা যায়। এসব তথ্য গ্রাহকদের বিলসংক্রান্ত উদ্বেগ কমাতে সহায়তা করতে পারে। জরুরি ব্যালেন্সের সুবিধার কারণে রিচার্জের টাকা শেষ হলেও সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এড়ানো সম্ভব।

শফিকুল আলমের মতে, প্রিপেইড মিটারের সুবিধা ও ব্যবহারবিধি সম্পর্কে গ্রাহকদের মধ্যে তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। এ ঘাটতি কমাতে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান আয়োজন এবং গণমাধ্যমে তথ্য প্রচার করতে পারে।

কোন সংস্থার কত গ্রাহক প্রিপেইড মিটারের আওতায়?

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ডিপিডিসি) প্রায় ২০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসি (নেসকো) জানিয়েছে, তাদের ২৩ লাখের বেশি গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৪ লাখ প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন।

ঢাকা ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই পিএলসির (ডেসকো) ১৪ লাখ ১১ হাজার ৪৩০ জন গ্রাহকের মধ্যে ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৩৮১ জন প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন। ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) ১৭ লাখ ৫৫ হাজার ৯১৪ জন গ্রাহকের মধ্যে এ মিটার রয়েছে ৬ লাখ ৬৬ হাজার ৬২৭ জনের।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বাবিউবো) মোট ৪৬ লাখ ৫ হাজার ১৯ জন গ্রাহকের মধ্যে ৩৬ লাখ ৮ হাজার ৩৩১ জন প্রিপেইড মিটারের আওতায় এসেছেন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীন প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ প্রিপেইড মিটার ব্যবহার করছেন।

বিদ্যুৎ বিভাগের কেন্দ্রীয় হটলাইন ১৬৯৯৯ নম্বরে প্রিপেইড মিটারসংক্রান্ত তথ্য ও অভিযোগ জানানো যায়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর নিজস্ব হটলাইনও রয়েছে।

পর্যায়ক্রমে সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা

নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মশিউর রহমান বাসসকে বলেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে দেশের সব গ্রাহককে প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনা হবে। এ উদ্যোগের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। শুরুতে কিছু এলাকায় এ ব্যবস্থা নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে নেতিবাচক মনোভাব থাকলেও বর্তমানে তেমন সমস্যা নেই বলে জানান তিনি। নেসকোর ৬০ শতাংশের বেশি গ্রাহকের প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা অনুবিভাগ) নূর আহমদ বলেন, প্রিপেইড মিটারে রিবেটসহ বিভিন্ন সুবিধা রয়েছে, যা গ্রাহকের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে পারে। তার মতে, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার অপরিহার্য। এ ব্যবস্থায় কার্যক্রমের বিভিন্ন ধাপও কমিয়ে আনা সম্ভব।

Social Icons