GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / অর্থনীতি ও বাণিজ্য / অর্থনীতি / ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? ৫ হাজার টাকা জরিমানার নিয়ম জানুন

ই-টিন আছে, রিটার্ন দেননি? ৫ হাজার টাকা জরিমানার নিয়ম জানুন

ই-টিন বা টিআইএন নিবন্ধন থাকার পরও আয়কর রিটার্ন জমা না দিলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে—সম্প্রতি এমন তথ্য ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে ই-টিনধারী প্রত্যেক ব্যক্তির ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এই জরিমানা প্রযোজ্য নয়। আয়কর আইন, ২০২৩ অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার ধরন, আগের আয় নিরূপণের অবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আইনি শর্তের ভিত্তিতে জরিমানার পরিমাণ নির্ধারিত হয়।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন দাখিল না করার জন্য জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ হলেই কেবল আইন অনুযায়ী জরিমানা আরোপের বিষয়টি বিবেচিত হবে।

## রিটার্ন জমা না দিলে জরিমানা কত?

আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬(১) ধারা অনুযায়ী, যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া আইনে উল্লেখিত ধারাগুলোর অধীনে রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট উপকর কমিশনার জরিমানা আরোপ করতে পারেন।

প্রতিবেদনে উল্লেখিত বিধান অনুযায়ী, জরিমানার হিসাব নির্ধারণে সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর ধার্য কর বিবেচনায় নেওয়া হতে পারে। জরিমানার পরিমাণ হতে পারে ওই করের ১০ শতাংশ, তবে ন্যূনতম জরিমানা ১ হাজার টাকা। ব্যর্থতা অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত ৫০ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে জরিমানার সর্বোচ্চ সীমা করদাতার পরিস্থিতি অনুযায়ী আলাদা।

**আগে আয় নিরূপণ হয়নি:** ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তে সর্বোচ্চ জরিমানা ৫ হাজার টাকা।

**আগে আয় নিরূপণ হয়েছে:** সর্বশেষ নিরূপিত আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ অথবা ১ হাজার টাকা—যেটি বেশি, সেটি সর্বোচ্চ জরিমানার সীমা হিসেবে প্রযোজ্য হতে পারে।

অর্থাৎ, ৫ হাজার টাকা সবার জন্য নির্ধারিত জরিমানা নয়। কারও রিটার্ন বকেয়া থাকলেই একই অঙ্কের জরিমানা হবে, এমন ধারণাও সঠিক নয়। সংশ্লিষ্ট আইন ও করদাতার পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

## ই-টিন থাকলেই কি রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?

আয়কর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নির্ধারিত হয় আয়কর আইন ও সংশ্লিষ্ট বিধানের ভিত্তিতে। শুধু আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকার কারণে সবাই রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত—এমন নয়।

সাধারণভাবে যেসব ব্যক্তি বা শ্রেণির করদাতার রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন—

– যাঁদের বার্ষিক আয় প্রযোজ্য করমুক্ত সীমা অতিক্রম করে।
– যাঁদের ক্ষেত্রে আগের বছরগুলোর আয় নিরূপণ বা করযোগ্য আয়ের বিষয়ে আইনি শর্ত প্রযোজ্য।
– ফার্মের অংশীদার।
– কোম্পানির শেয়ারহোল্ডার পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার কর্মচারী।
– সরকারি কর্মচারীসহ আইন দ্বারা নির্দিষ্ট শ্রেণির ব্যক্তি।
– যাঁদের নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ বা আইনগত প্রয়োজনে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণ দিতে হয়।

এ ছাড়া আইন অনুযায়ী অন্যান্য শ্রেণির ব্যক্তির ক্ষেত্রেও রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক হতে পারে। তাই শুধু ই-টিন আছে কি না বা বর্তমানে আয় করযোগ্য কি না—এই দুটি বিষয় দেখেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

## আয়কর রিটার্ন জমার শেষ তারিখ কখন?

প্রতিবেদনে উল্লেখিত এনবিআরের সাধারণ নির্দেশনা অনুযায়ী, স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার জন্য সাধারণ করদিবস ৩০ নভেম্বর। তবে কোনো নির্দিষ্ট করবর্ষে এনবিআর সময়সীমা বাড়ালে সংশ্লিষ্ট বর্ধিত সময়সীমা প্রযোজ্য হবে।

আগের করবর্ষেও রিটার্ন জমার সময়সীমা কয়েক ধাপে বাড়ানো হয়েছিল। তাই শুধু আগের বছরের তারিখ অনুসরণ না করে চলতি করবর্ষের জন্য এনবিআরের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি।

নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা দিতে না পারলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। দেরিতে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কর, অতিরিক্ত অর্থ বা জরিমানার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী যাচাই করতে হবে।

## আয় করমুক্ত হলে বা আয় কমে গেলে কী করবেন?

অনেকে ব্যাংকিং, ঋণ গ্রহণ, সম্পত্তি নিবন্ধন কিংবা অন্য কোনো প্রয়োজনে ই-টিন নিবন্ধন করেন। পরে তাঁদের আয় কমে যেতে পারে বা নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের প্রয়োজন নাও থাকতে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা রয়েছে কি না, তা যাচাই করা জরুরি। আয় করমুক্ত সীমার নিচে নেমে গেলেই রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা শেষ হয়ে যায়—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

প্রযোজ্য শর্ত পূরণ হলে টিআইএন বাতিলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা যেতে পারে। তবে আবেদন করলেই টিআইএন বাতিল হয়ে যায় না; বিষয়টি কর্তৃপক্ষের যাচাই ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। একই সঙ্গে টিআইএন বাতিল এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা দুটি পৃথক বিষয়।

## অনলাইনে রিটার্ন জমার অবস্থা যেভাবে যাচাই করবেন

ই-টিন নেওয়ার পর কোনো করবর্ষে রিটার্ন জমা দিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত না হলে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

**১. ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করুন**

এনবিআরের ই-রিটার্ন পোর্টাল [etaxnbr.gov.bd](https://etaxnbr.gov.bd/)–এ প্রবেশ করে নিজের অ্যাকাউন্টে লগইন করুন।

**২. রিটার্ন জমার রেকর্ড যাচাই করুন**

কোন কোন করবর্ষের রিটার্ন জমা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট প্রাপ্তিস্বীকার বা রিটার্নের রেকর্ড রয়েছে কি না, তা দেখুন।

**৩. বকেয়া রিটার্ন থাকলে ব্যবস্থা নিন**

যে করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি, সেটি শনাক্ত করে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল করুন। দেরির কারণে কোনো কর, সুদ বা জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা-ও যাচাই করুন।

**৪. জরিমানার নোটিশ পেলে কর অফিসে যোগাযোগ করুন**

কোন করবর্ষে এবং কী কারণে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর সার্কেল থেকে নিশ্চিত করুন। প্রয়োজন হলে কর আইনজীবী বা অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সহায়তা নিন।

## অনলাইনে রিটার্ন জমার আগে যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকবেন

রিটার্ন দাখিলের সময় সঠিক করবর্ষ নির্বাচন এবং আয়, বিনিয়োগ, সম্পদ ও দায়ের তথ্য যথাযথভাবে দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি প্রযোজ্য কর, অগ্রিম কর ও উৎসে কর্তিত করের তথ্য যাচাই করতে হবে।

রিটার্ন জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকার বা সংশ্লিষ্ট রেকর্ড সংরক্ষণ করুন। অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা অননুমোদিত ওয়েবসাইটে নিজের জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য, টিআইএন, পাসওয়ার্ড বা আর্থিক তথ্য দেবেন না।

২০২৬-২৭ করবর্ষে স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতাদের অনলাইনে রিটার্ন দাখিলের বিষয়ে এনবিআরের নির্দেশনা রয়েছে। তবে নির্ধারিত কিছু শ্রেণির করদাতা ও বিশেষ পরিস্থিতিতে অনুমোদিত বিকল্প পদ্ধতি প্রযোজ্য হতে পারে।

## ই-টিনধারীদের এখন কী করা উচিত?

ই-টিন আছে, কিন্তু রিটার্ন জমা দেওয়া হয়নি—এমন ব্যক্তিদের প্রথমে নিজের কর-সংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত ৫ হাজার টাকা জরিমানার তথ্য দেখে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ২৬৬ ধারায় জরিমানার পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে করদাতার আগের আয় নিরূপণ, রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার ধরন এবং আইনের প্রযোজ্য শর্ত বিবেচনা করতে হয়।

তাই সবার ক্ষেত্রে একই অঙ্কের জরিমানা হবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। নিজের ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক কি না এবং কোনো জরিমানা প্রযোজ্য কি না, তা নিশ্চিত হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।

Social Icons