GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / Uncategorized / মাটি খুঁড়লেই গুপ্তধন! বিদেশে পাচার হচ্ছে কোটি টাকার প্রত্নসম্পদ

মাটি খুঁড়লেই গুপ্তধন! বিদেশে পাচার হচ্ছে কোটি টাকার প্রত্নসম্পদ

উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় মাটির নিচে থাকা প্রাচীন প্রত্নসম্পদ ঘিরে গড়ে উঠেছে কেনাবেচা ও পাচারের একটি চক্র—এমন অভিযোগ উঠেছে। নওগাঁর পুনর্ভবা নদীর তীর থেকে বগুড়ার মহাস্থানগড়, নাটোর ও সিরাজগঞ্জ হয়ে রাজধানী ঢাকার গুলশান পর্যন্ত বিস্তৃত এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের মাধ্যমে মূল্যবান পাথর, কষ্টিপাথরের মূর্তি ও অন্যান্য পুরাকীর্তি বিদেশে পাচার হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব প্রত্নসম্পদের সম্ভাব্য গন্তব্যের মধ্যে রয়েছে ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডের বিভিন্ন বাজার। মাটির নিচে থাকা ঐতিহাসিক নিদর্শন সংগ্রহের আশায় উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে চলছে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি। এতে একদিকে প্রত্নসম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

## পুনর্ভবা নদীর তীরে চলছে মাটি খোঁড়াখুঁড়ি

নওগাঁর পোরশা উপজেলার নিতপুরের টেকঠা এলাকায় পুনর্ভবা নদীর তীরবর্তী প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে মাটি খুঁড়ে প্রত্নসম্পদ খোঁজার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শেরশাহ ও সুজাউদ্দীনের আমলে এই নদী অববাহিকায় ঐতিহাসিক বাণিজ্যকেন্দ্র ও প্রাচীন কালীমন্দিরকেন্দ্রিক জনপদ ছিল। সময়ের ব্যবধানে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে কয়েক শতাব্দী আগের বিভিন্ন নিদর্শন মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারে বলে ধারণা স্থানীয়দের।

কয়েক বছর আগে টেকঠা ভিটায় মাটি কাটার সময় কিছু প্রত্ননিদর্শন পাওয়ার পর সেখানে খোঁড়াখুঁড়ি বাড়তে থাকে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিদিন বিভিন্ন দল কোদাল ও শাবল নিয়ে চার থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রা, রুপার অলংকার, চকচকে রঙিন পাথর এবং কষ্টিপাথরের মূর্তি খোঁজে।

এসব পাথরের মধ্যে ‘দানা’ নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের পাথর রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ১০ গ্রাম ওজনের একটি বিশেষ পাথর বিক্রি করেও কখনো পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা পাওয়া যায়।

## তিন দিনে পাথর পেয়ে বিক্রি এক লাখ ৬০ হাজার টাকায়

পোরশার টেকঠা এলাকায় প্রত্নসম্পদ খোঁজার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন পাশের বিষ্ণুপুর গ্রামের বাসিন্দা মনিরুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাত থেকে আটজন মিলে তিন দিন মাটি খুঁড়ে তাঁরা একটি ‘জালি বল’ বা ‘দানা’ পান। পরে সেটি জামিরুল নামের এক ব্যক্তির কাছে এক লাখ ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করেন।

নিতপুর এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গামা অভিযোগ করেন, প্রত্নসম্পদ রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি প্রত্নসম্পদ সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি এবং পাচারচক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

## ‘দানা’ সংগ্রহ ও পাচারে পৃথক চক্রের অভিযোগ

অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল্যবান ‘দানা’ এবং কষ্টিপাথরের মূর্তি সংগ্রহ ও পাচারের জন্য পৃথক দুটি সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, নওগাঁর নিতপুরের নুরুল হুদার দুই ছেলে আমিরুল ও জামিরুলের নেতৃত্বে ‘দানা’ সংগ্রহের একটি চক্র কাজ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে আতাউর রহমান মিশু, মোসাদ্দেক ও আতাবুলের সম্পৃক্ততার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সংগৃহীত পাথরগুলো বগুড়ার নন্দীগ্রামের কীটনাশক ব্যবসায়ী সবুজের কাছে পৌঁছানো হয় বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখান থেকে ঢাকার ক্রেতা এবং বিদেশি ক্রেতাদের কাছে এসব পাথর সরবরাহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।

তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

## মহাস্থানগড় ঘিরে কষ্টিপাথরের মূর্তি বাণিজ্যের অভিযোগ

বগুড়ার প্রাচীন মহাস্থানগড় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। প্রতিবেদনটিতে অভিযোগ করা হয়েছে, এই এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে কষ্টিপাথরের মূর্তি ও অন্যান্য প্রাচীন নিদর্শন সংগ্রহ করা হচ্ছে।

মহাস্থানগড় এলাকার মূর্তি কেনাবেচার সঙ্গে সুজন, ধলু, রফিক ও জহুরুলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রফিক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। এ ছাড়া নাটোরের সিংড়া এলাকার কালীগঞ্জের পওতা গ্রামের সাইদুর, একই উপজেলার থাওল গ্রামের মহসিন এবং শেরপুরের ফারুক, সুলতান ও গোপী ঘোষের নামও এসেছে।

অন্যদিকে, নাটোরের সিংড়ায় মহসিন, তাঁর ছেলে আবু সাঈদ ও সাঈদুল এবং পাটুল এলাকার মামুনের বিরুদ্ধে তৃণমূল পর্যায় থেকে কষ্টিপাথর সংগ্রহের অভিযোগ রয়েছে। সিরাজগঞ্জের স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি চক্রও এই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

## গুলশান থেকে বিদেশে পাঠানোর অভিযোগ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগৃহীত কষ্টিপাথর, ‘দানা’ ও প্রাচীন মূর্তি ঢাকার গুলশান-২ ডিসিসি মার্কেটকেন্দ্রিক একটি চক্রের কাছে পৌঁছায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের নেতৃত্বে জাকির নামের এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর ছেলে সুমনসহ আরও কয়েকজনের নামও প্রতিবেদনে এসেছে।

এ ছাড়া সিরাজের ছেলে সমসের ও মামুন, আবুল ও তাঁর ছেলে জিতু, জলিলের মেয়ে নাসরিন এবং নান্নুসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জিতু ফ্রান্সে থাকেন।

জাফর নামের আরেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অতীতে প্রত্নসম্পদ পাচারের অভিযোগে ভারতে দীর্ঘদিন কারাভোগের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের দাবি, বর্তমানে তিনি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সামনে একটি পুরোনো কাঁসার দোকান খুলেছেন এবং আবারও একই ধরনের কারবারে জড়িয়েছেন।

বিদেশি ক্রেতারা রাজধানীর বারিধারার স্যুট প্যালেসসহ বিভিন্ন অভিজাত হোটেলে অবস্থান করে লেনদেন চূড়ান্ত করেন বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

তবে উল্লিখিত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য বা আদালতে প্রমাণিত কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। ফলে এসব অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।

## প্রত্নসম্পদের মালিক রাষ্ট্র, বলছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর

প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণ ও আইনগত অবস্থান সম্পর্কে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক একেএম সাইফুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে উদ্ধার হওয়া প্রত্ননিদর্শনগুলো প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

তিনি জানান, ভূগর্ভে পাওয়া ঐতিহাসিক প্রত্নবস্তুর মালিক রাষ্ট্র। কোনো নাগরিক এমন নিদর্শন খুঁজে পেলে তা ব্যক্তিগতভাবে কেনাবেচা করা কিংবা নিজের কাছে রেখে দেওয়া বেআইনি ও দণ্ডনীয় অপরাধ।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন শুধু মূল্যবান বস্তু নয়; এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অতীতের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জনপদের পরিচয়। তাই অবৈধ খনন ও পাচারের অভিযোগ তদন্তের পাশাপাশি এসব ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে গুরুত্ব পাচ্ছে বিষয়টি।

 

Social Icons