জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বাদী ও অন্যতম সাক্ষী মানিক পশারীকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এবার তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন ছোটভাই চান মিয়া পশারী। তাঁর দাবি, সাঈদীর পক্ষে কথা বলার কারণে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি মানিক পশারী।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকালে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন চান মিয়া। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পুরোনো ভিডিও সাক্ষাৎকারে নিজের দেওয়া বক্তব্যের সত্যতাও স্বীকার করেন তিনি।
মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম না থাকার অভিযোগ
চান মিয়া পশারী নিজেকে একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে উল্লেখ করে দাবি করেন, তাঁর বড়ভাই মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করেননি। এর কারণ হিসেবে তিনি সাঈদীর পক্ষে কথা বলার বিষয়টি তুলে ধরেন।
চান মিয়ার ভাষ্য, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরা বয়সে ছোট ছিলেন এবং পরিস্থিতির কারণে জঙ্গলে পালিয়ে থাকতে হয়েছিল। তাঁর দাবি, মানিক পশারী তখন ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন।
নিজের নাম তালিকায় না থাকার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে চান মিয়া বলেন, তাঁর ভাই যাঁদের পছন্দ করেছেন, তাঁদের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় দিয়েছেন; কিন্তু তাঁর নাম দেননি। সাঈদীর পক্ষে কথা বলার কারণেই এমনটি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
চান মিয়া আরও অভিযোগ করেন, তাঁর বড়ভাই কখনো তাঁকে আর্থিকভাবে সহায়তা করেননি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মানিক পশারীর বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
পুরোনো ভিডিওতে কী বলেছিলেন চান মিয়া?
পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী এর আগে চান মিয়া পশারীর একটি পুরোনো ভিডিও সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেন। সেখানে মানিক পশারীকে ‘ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা’ দাবি করার প্রসঙ্গও সামনে আসে।
ভিডিওতে চান মিয়াকে বলতে শোনা যায়, তাঁকে ও তাঁর ভাইকে আর্থিক প্রলোভন দেখানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, তিনি সেই প্রলোভনে রাজি না হলেও মানিক পশারী অর্থের প্রলোভনে সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেন এবং সাক্ষ্য দেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে সোমবার দুপুরে চান মিয়ার বাড়িতে যান গণমাধ্যমের প্রতিনিধি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে চান মিয়া জানান, ভিডিওতে প্রচারিত বক্তব্য তাঁর নিজের।
তবে ভিডিওতে উত্থাপিত অভিযোগের স্বাধীন যাচাই কিংবা সংশ্লিষ্ট মামলার নথির ভিত্তিতে সেগুলোর সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
সাঈদীকে নিয়ে কী বললেন চান মিয়া?
দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে চান মিয়া বলেন, সাঈদী রাজাকার ছিলেন না। তাঁর দাবি, ওই সময় সাঈদী বয়সে ছোট ছিলেন। বরং রামেস মোল্লা, মোসলেম মাওলানা ও সেকেন্দার শিকদার রাজাকার ছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এগুলো চান মিয়া পশারীর ব্যক্তিগত বক্তব্য। তাঁর এই দাবির পক্ষে প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো তথ্য তুলে ধরা হয়নি।
মানিক পশারীর বোনের বক্তব্য
এদিকে মানিক পশারীর বোন হাসিনা বেগমও এ বিষয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, তাঁদের পরিবারের সবাই আওয়ামী লীগ করেন এবং মুক্তিযোদ্ধা।
মানিক পশারী অর্থের বিনিময়ে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি রসিকতার সুরে মন্তব্য করেন, তাঁর ভাইকে অনেক টাকা দেওয়া হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে, মানিক পশারীর আরেক বোন হেনা পশারী সাঈদীকে ‘আল্লাহর ওলি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর ভাই কেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
হেনা পশারী বলেন, ঘটনার সময় তিনি খুলনায় শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। পরে এ বিষয়ে ভাইয়ের সঙ্গে তাঁদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে ভাইয়ের কাছে কিছু জানতে চাননি বলেও জানান তিনি।
অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা
মানিক পশারীর বিরুদ্ধে তাঁর ছোটভাইয়ের বক্তব্য, পুরোনো ভিডিও সাক্ষাৎকার এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
তবে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত না করার কারণ, আর্থিক প্রলোভনের অভিযোগ এবং সাঈদীর বিরুদ্ধে করা মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে উত্থাপিত দাবিগুলোর সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট নথি ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। প্রকাশিত প্রতিবেদনে মানিক পশারীর প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।









