আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন সমঝোতার অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে রাজনৈতিক অবিশ্বাস আরও বেড়েছে। বিএনপির অভিযোগ, সরকারকে অস্থিতিশীল করতে জামায়াত আওয়ামী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। তবে এই অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে জামায়াত। দলটির পাল্টা দাবি, আওয়ামী লীগের সঙ্গে বরং বিএনপিরই সমঝোতা রয়েছে।
একসময় আওয়ামী লীগবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি ও জামায়াত একসঙ্গে রাজনীতি করেছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে। পরে ২০০১ সালে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার ছিল জামায়াত। ক্ষমতার বাইরে থাকাকালেও দুই দলকে দীর্ঘদিন একসঙ্গে আন্দোলন করতে দেখা গেছে।
তবে রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। বিএনপি বর্তমানে সরকারে এবং জামায়াত বিরোধী দলে। এই অবস্থায় দুই দলের মধ্যে সংবিধান সংস্কার ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ সামনে এসেছে।
আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাত নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
সম্প্রতি রাজশাহীর এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জামায়াতের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার অভিযোগ তোলেন। তিনি দাবি করেন, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ তৈরির পেছনে আওয়ামী লীগের অর্থায়ন রয়েছে। আর এ কাজে একটি রাজনৈতিক দল সহযোগিতা করছে।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর বিএনপির অন্য নেতারাও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তবে জামায়াত এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকার জামায়াতের শীর্ষ পাঁচ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে এবং দলটির কার্যালয় বন্ধ রেখেছিল। এমন একটি দলের সঙ্গে জামায়াতের সমঝোতা হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
উল্টো বিএনপির বিরুদ্ধেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আঁতাতের অভিযোগ তুলেছেন তিনি।
হামিদুর রহমান আযাদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামায়াতকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন ও অনুমতি নিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করতে পেরেছে।
বিএনপির সন্দেহের পেছনে যেসব কারণ
জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের যোগাযোগ থাকার বিষয়ে বিএনপির সন্দেহের পেছনে কয়েকটি কারণ তুলে ধরছেন দলটির নেতারা।
প্রথমত, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উল্লেখ করা গোয়েন্দা তথ্য। দ্বিতীয়ত, সরকারের বিরুদ্ধে জামায়াতের চলমান আন্দোলন। বিএনপি এই আন্দোলনকে সরকার পতনের প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ৫ আগস্টের পর জামায়াতের পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগকে ক্ষমা করে দেওয়ার বক্তব্য এসেছিল। এ ধরনের বক্তব্য থেকেই মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
রিজভীর অভিযোগ, জামায়াত গোপনে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে সরকারকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে। তাঁর মতে, এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে।
তবে বিএনপির সন্দেহের আরেকটি বড় কারণ হলো জুলাই সনদ ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দুই পক্ষের মতবিরোধ।
জুলাই সনদ ও সংবিধান নিয়ে বিরোধ
বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক দূরত্বের অন্যতম কারণ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কারের পদ্ধতি।
জামায়াতসহ ১১ দল চায়, গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদ সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করা হোক। অন্যদিকে বিএনপি সনদের যেসব বিষয়ে আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো বাদ দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
সংবিধান নিয়েও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে। জামায়াত ও তাদের সহযোগী দলগুলো সংবিধানের ব্যাপক সংস্কার চায়। বিএনপি চায় সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে।
বিরোধী দলগুলোর দাবি পূরণ না হওয়ায় তারা রাজপথে আন্দোলনে নেমেছে। অন্যদিকে বিএনপি দ্রুত জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি নির্ধারণ করে বিষয়টির সমাধান চায়।
সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়া নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে। বিএনপি সংসদে সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও বিরোধী দলগুলো তা বর্জন করেছে।
বিএনপির আশঙ্কা, রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া একতরফাভাবে সংবিধান সংশোধন করা হলে এর নৈতিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর অনড় অবস্থানকেও সন্দেহের চোখে দেখছে ক্ষমতাসীন দল।
রুহুল কবির রিজভীর বক্তব্য অনুযায়ী, সংবিধানে আমূল পরিবর্তনের দাবিতে বিরোধী দলগুলো অনড় থাকলে রাজনৈতিক বিভাজন বাড়তে পারে। এতে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জামায়াতের পাল্টা অভিযোগ কী?
বিএনপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে হামিদুর রহমান আযাদ দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করেই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নির্বাচনের আগেই এই সমঝোতা হয়েছিল।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সরকার দেশ পরিচালনায় ব্যর্থ হয়ে জনগণের দৃষ্টি অন্যদিকে সরানোর চেষ্টা করছে। জুলাই সনদ ও গণভোট বাস্তবায়নের বিষয় এড়িয়ে রাজনৈতিক বিভ্রান্তি তৈরি করা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জামায়াতের দাবি, এসব অভিযোগের মাধ্যমে মূল রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো থেকে মানুষের মনোযোগ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ কী বলছে?
বিএনপি ও জামায়াতের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের বিষয়ে আওয়ামী লীগের বক্তব্যও সামনে এসেছে।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাসিম জানিয়েছেন, বিএনপি, জামায়াত কিংবা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে আওয়ামী লীগের কোনো সমঝোতা নেই।
তিনি দাবি করেন, এসব দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আদর্শগত কোনো পার্থক্য নেই। তবে দলটির সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই বলে জানান তিনি।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের অনেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।
সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের আঁতাতের অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট হচ্ছে। তবে দুই দলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি।









