বিমানবাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির (২৭) মৃত্যুর ঘটনায় এখনো রহস্যের জট খোলেনি। বিশেষ করে মধ্যরাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাহসিফ ও তার বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের যাওয়ার কারণ জানতে তদন্ত চালাচ্ছে পুলিশ। সেখানে কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কী পরিস্থিতিতে তাহসিফ তুরাগ নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলেন, সেসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।
তারা মাদক কারবারিদের ধাওয়ার মুখে পড়েছিলেন, নাকি পুলিশের কোনো অভিযানের কারণে সেখানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এদিকে এ ঘটনায় গ্রেফতার তাহসিফের কথিত বান্ধবী জেরিকা তাসনীম দিশাকে (১৯) চার দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছেন আদালত। রোববার ঢাকা মহানগর হাকিম আদালত এ আদেশ দেন।
এর আগে শনিবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর কাফরুল এলাকা থেকে দিশাকে গ্রেফতার করে নৌপুলিশ। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন কেন?
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, আগে রিমান্ডে থাকা তাহসিফের জুনিয়র বন্ধু আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে দিশার তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ রিমান্ড বাতিল করে জামিনের আবেদন করেন। তিনি দাবি করেন, ঘটনার সঙ্গে দিশার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
তার আইনজীবীর ভাষ্য, রাত ১২টার দিকে তাহসিফ গাড়িতে করে দিশাকে বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তাদের মধ্যে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
উভয় পক্ষের বক্তব্য শোনার পর আদালত দিশার চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নৌপুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে দীপ একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। তার বক্তব্যে বেশ কিছু অসংগতি পাওয়া গেছে। এসব তথ্য যাচাই করতেই দিশাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
মাজার বস্তিতে যাওয়ার কারণ নিয়ে তদন্ত
তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ধারণা, বার থেকে বের হওয়ার পর তাহসিফ ও দীপ আরও মাদক সংগ্রহের উদ্দেশ্যে মাজার বস্তি এলাকায় গিয়ে থাকতে পারেন। ওই এলাকাটি মাদকের অন্যতম বড় স্পট হিসেবে পরিচিত বলে জানান তিনি। তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, দীপের মধ্যে মাদক সেবনের লক্ষণও পাওয়া গেছে।
তবে তারা কেন সেখানে গিয়েছিলেন, কারও সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা ছিল কি না কিংবা অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা এখনো নিশ্চিত নয়। এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে স্থানীয় বাসিন্দা, সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন তদন্তকারীরা।
নৌপুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, দিশার সঙ্গে তাহসিফের দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল। তাহসিফের মোবাইল ফোনে দিশার সঙ্গে একাধিকবার কথোপকথনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
তাহসিফ ও দীপ কেন মাজার বস্তিতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে কেউ তাদের ধাওয়া করেছিল কি না, জানতে চাইলে পুলিশ সুপার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে এখনো নিশ্চিত তথ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
তিনি জানান, বার থেকে বের হওয়ার পর তাদের আরও কিছু প্রত্যাশা ছিল বলে দীপ জানিয়েছেন। তবে সত্যিই কেউ তাদের ধাওয়া করেছিল কি না, করে থাকলে কারা ছিল, তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
যেভাবে উদ্ধার হয় তাহসিফের মরদেহ
এর আগে বুধবার তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করে নৌপুলিশ।
ঘটনার পর তাহসিফের বন্ধু দীপকে প্রথমে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) হেফাজতে নেয়। পরে দীপকে সঙ্গে নিয়ে তাহসিফের মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয় এবং ঘটনাস্থলও পরিদর্শন করে পিবিআই।
শুক্রবার রাতে তাহসিফের বাবা এনায়েত করিম উত্তরখান থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এরপর দীপকে নৌপুলিশের কাছে হস্তান্তর করে পিবিআই।
শনিবার মামলার প্রধান আসামি দীপকে চার দিনের রিমান্ডে নেয় পুলিশ। এখন তার বক্তব্যের সঙ্গে দিশার দেওয়া তথ্য মিলিয়ে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।









