জামাতে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের পেছনে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়ানোই সাধারণ নিয়ম। ইমাম নামাজ পরিচালনা করেন এবং মুক্তাদিরা তাঁর অনুসরণ করে রুকু, সিজদা ও অন্যান্য কাজ সম্পন্ন করেন। কিন্তু কখনো কখনো মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা অনেক বেশি হলে কিংবা জায়গার সীমাবদ্ধতার কারণে কাতারের অবস্থান নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। বিশেষ করে মসজিদে নববীতে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের সামনের দিকেও অনেক মুসল্লিকে কাতারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
এমন দৃশ্য দেখে অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে জামাতে নামাজ আদায় করলে কি সেই নামাজ শুদ্ধ হবে? ইমামের আগে অবস্থান করে নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের বিধান কী? এ বিষয়ে হানাফি ফিকাহর আলোকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দিয়েছেন মুফতি শফিকুল ইসলাম হাটহাজারী।
তিনি জামিআ মুহাম্মাদিয়া আরাবিয়া, মোহাম্মদপুরের মুফতি ও মুহাদ্দিস। একজন প্রশ্নকারীর করা প্রশ্নের উত্তরে তিনি জামাতে নামাজের সময় ইমাম ও মুক্তাদির অবস্থান সম্পর্কে শরিয়তের বিধান তুলে ধরেন।
মসজিদে নববীতে ইমামের সামনেও মুসল্লিদের দাঁড়াতে দেখা যায় কেন?
মসজিদে নববী মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও পবিত্র স্থান। সেখানে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মুসল্লি নামাজ আদায় করেন। বিশেষ করে হজ ও ওমরাহর মৌসুমে মুসল্লিদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মুসল্লিরা মসজিদে নববী ও এর আশপাশের এলাকায় জামাতে নামাজে অংশ নেন।
মুসল্লিদের সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে মসজিদের ভেতরের জায়গার পাশাপাশি বাইরের খোলা চত্বরেও নামাজের কাতার তৈরি হয়। এ সময় বিভিন্ন দিক থেকে কাতার বিস্তৃত হতে দেখা যায়। ফলে অনেকের কাছে এমন দৃশ্য তৈরি হয়, যেখানে কিছু মুসল্লি ইমামের সামনের দিকেও অবস্থান করছেন বলে মনে হয়।
এ পরিস্থিতিতে প্রশ্ন ওঠে, ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে মুক্তাদির নামাজের কী অবস্থা হবে? শুধু মসজিদে নববী হওয়ার কারণে কি এ ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান পরিবর্তিত হবে? নাকি অন্য মসজিদের মতো এখানেও একই নিয়ম প্রযোজ্য?
প্রশ্নকারী কী জানতে চেয়েছেন?
এক প্রশ্নকারী মুফতি শফিকুল ইসলামের কাছে জানতে চান, মসজিদে নববীতে জামাতে নামাজ আদায়ের সময় হাজার হাজার মুসল্লিকে ইমামের সামনের দিকে কাতারবদ্ধ হয়ে নামাজ পড়তে দেখা যায়। এ অবস্থায় ইমামের আগে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে শরিয়তের বিধান কী হবে?
প্রশ্নটির মূল বিষয় হলো, জামাতে নামাজের সময় ইমাম ও মুক্তাদির অবস্থানের মধ্যে কী ধরনের সম্পর্ক থাকা জরুরি। একজন মুক্তাদি কি কোনো অবস্থায় ইমামের সামনে দাঁড়াতে পারেন? এমন অবস্থানে নামাজ আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে কি না, সেটিই জানতে চাওয়া হয়েছে।
ইমামের আগে দাঁড়ালে মুক্তাদির নামাজ হবে কি?
এ প্রশ্নের জবাবে মুফতি শফিকুল ইসলাম বলেন, কোনো মুক্তাদি ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে তার নামাজ শুদ্ধ হবে না। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ইমামের আগে মুক্তাদির অবস্থান করা নামাজ নষ্ট হওয়ার কারণ।
তিনি স্পষ্ট করে বলেন, মসজিদে নববী হলেও এ বিধানের পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ কোনো মুসল্লি যদি মসজিদে নববীতে জামাতে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে যান, তাহলেও তাঁর নামাজ শুদ্ধ হবে না বলে তিনি মত দিয়েছেন।
এমনকি মসজিদের ভেতরের অংশের পরিবর্তে সামনের খোলা চত্বরে দাঁড়ালেও বিধানের পরিবর্তন হবে না বলে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নামাজের স্থান পবিত্র ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়ার কারণে ইমামের সামনে দাঁড়ানোর বিষয়টি বৈধ হয়ে যায় না।
ইমামের সামনে দাঁড়ানোর বিষয়ে ফিকাহর বিধান কী?
নিজের বক্তব্যের পক্ষে মুফতি শফিকুল ইসলাম হানাফি ফিকাহর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ ফাতাওয়া আলমগিরি থেকে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। সেখানে ইমামের আগে মুক্তাদির অবস্থান করার বিষয়ে বিধান তুলে ধরা হয়েছে।
গ্রন্থটিতে বলা হয়েছে:
وَلَوْ تَقَدَّمَ عَلَى الْإِمَامِ مِنْ غَيْرِ عُذْرٍ فَسَدَتْ صَلَاتُهُ. كَذَا فِي فَتَاوَى قَاضِي خَانْ.
উদ্ধৃত আরবি বক্তব্যের বাংলা অর্থ হলো, কোনো ওজর বা গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া মুক্তাদি ইমামের সামনে চলে গেলে তার নামাজ নষ্ট হয়ে যাবে। ফাতাওয়া কাজিখানেও একই বিধানের উল্লেখ রয়েছে।
এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, জামাতে নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে ইমামের তুলনায় মুক্তাদির অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। মুক্তাদির উচিত ইমামের পেছনে অবস্থান করে জামাতে অংশ নেওয়া। ইমামের আগে অবস্থান করে নামাজ আদায় করা সাধারণ নিয়মের পরিপন্থী।
শুধু মসজিদে নববী হলেই কি বিধান আলাদা হবে?
প্রশ্নটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, মসজিদে নববীর মতো পবিত্র স্থানে নামাজ আদায়ের সময় ইমামের সামনে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে আলাদা কোনো বিধান আছে কি না।
মুফতি শফিকুল ইসলামের দেওয়া উত্তরে এমন কোনো বিশেষ ছাড়ের কথা উল্লেখ করা হয়নি। বরং তিনি বলেছেন, মসজিদে নববী হলেও ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে তা শুদ্ধ হবে না।
অর্থাৎ তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মসজিদের মর্যাদা বা অবস্থান বিবেচনায় ইমামের আগে দাঁড়ানোর বিধান পরিবর্তিত হয় না। মসজিদের ভেতরে হোক কিংবা সামনের খোলা চত্বরে, মুক্তাদির অবস্থান ইমামের সামনে হলে একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
তবে এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়। মূল উদ্ধৃতিতে স্পষ্টভাবে ‘কোনো ওজর ছাড়া’ ইমামের সামনে চলে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। তাই বিষয়টি নিয়ে বাস্তবে কোনো বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হলে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত না নিয়ে যোগ্য আলেম বা মুফতির কাছে বিস্তারিত জেনে নেওয়া ভালো।
ফাতাওয়া আলমগিরির উদ্ধৃতি কোথা থেকে নেওয়া হয়েছে?
মুফতি শফিকুল ইসলাম তাঁর উত্তরে ফাতাওয়া আলমগিরি গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ১০৩ নম্বর পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি উল্লেখ করেছেন। প্রকাশনা হিসেবে মাকতাবায়ে জাকারিয়া, দেওবন্দের নাম দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া উদ্ধৃত আরবি বক্তব্যে ফাতাওয়া কাজিখান গ্রন্থের কথাও উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ ইমামের আগে মুক্তাদির অবস্থান করার বিষয়ে হানাফি ফিকাহর একাধিক প্রসিদ্ধ গ্রন্থে বিধানের উল্লেখ রয়েছে বলে তাঁর উত্তরে তুলে ধরা হয়েছে।
জামাতে নামাজ আদায়ের সময় মুসল্লিদের কী মনে রাখা উচিত?
জামাতে নামাজের ক্ষেত্রে ইমাম ও মুক্তাদির অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি। কাতারে দাঁড়ানোর সময় প্রত্যেক মুসল্লির উচিত নিজের অবস্থান সম্পর্কে সতর্ক থাকা এবং ইমামের অনুসরণ করে নামাজ আদায় করা।
মসজিদে জায়গার সংকট, মুসল্লির অতিরিক্ত উপস্থিতি কিংবা কাতার বিন্যাস নিয়ে কোনো জটিলতা তৈরি হলে নিজের মতো করে অবস্থান নির্ধারণ না করে মসজিদের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা অভিজ্ঞ আলেমের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে মসজিদে নববীর মতো বড় মসজিদে নামাজ আদায়ের সময় কাতারের বিন্যাস সব সময় সাধারণ মুসল্লির কাছে পরিষ্কার নাও হতে পারে। তাই দূর থেকে কোনো দৃশ্য দেখে তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। এ বিষয়ে নির্ভরযোগ্য আলেমের ব্যাখ্যা ও শরিয়তের দলিল জানা প্রয়োজন।
সবশেষে, মুফতি শফিকুল ইসলামের দেওয়া ব্যাখ্যা এবং ফাতাওয়া আলমগিরি থেকে উল্লেখ করা উদ্ধৃতি অনুযায়ী, কোনো ওজর ছাড়া মুক্তাদি ইমামের সামনে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করলে তাঁর নামাজ নষ্ট হবে। এ বিধান মসজিদে নববীসহ অন্য স্থানেও প্রযোজ্য বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।









