অভাবের সংসারে আর্থিক সংকট সামাল দিতে একসময় নিজের ফ্রিজটিই ভাড়া দিয়েছিলেন খায়রুল ইসলাম। মাসে মাত্র ৩০০ টাকার বিনিময়ে ফ্রিজটি ভাড়া দেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নতুন উদ্যোগ। সেই ছোট উদ্যোগ আজ বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে রয়েছে চার শতাধিক ফ্রিজ। এসব ফ্রিজ ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে দুই লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন তিনি।
বরিশাল সদর উপজেলার কুন্দইল পাড়া গ্রামের ফজলে আলি হাওলাদারের ছেলে খায়রুল ইসলাম। বরিশাল নগরীর কলেজ অ্যাভিনিউ এলাকায় দোকান ভাড়া নিয়ে পরিচালনা করছেন তাঁর ফ্রিজ ভাড়ার ব্যবসা। শিক্ষার্থীরাই মূলত তাঁর ব্যবসার বড় গ্রাহক। তবে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবারের মানুষও তাঁর কাছ থেকে ফ্রিজ ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করছেন।
ফ্রিজের আকার অনুযায়ী মাসিক ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। পুরোনো ফ্রিজ কিনে সেগুলো মেরামত করার পর গ্রাহকদের কাছে মাসিক চুক্তিতে ভাড়া দেন খায়রুল। ফ্রিজের নিয়মিত দেখভাল ও মেরামতের জন্য তাঁর পাঁচজন কর্মচারী রয়েছেন। ভাড়া সংগ্রহের পাশাপাশি কোনো ফ্রিজে সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত সেটি ঠিক করার ব্যবস্থা করেন তিনি।
আট লাখ টাকা লোকসান থেকে নতুন উদ্যোগ
খায়রুলের বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পথটি সহজ ছিল না। সাত ভাই-বোনের সংসারে তিনি ছিলেন সবার ছোট। তাঁর বাবা একটি স্কুলে দপ্তরির চাকরি করতেন। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে ২০০৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেই একটি মুদি দোকান শুরু করেন তিনি।
কিন্তু দীর্ঘ আট বছর ব্যবসা চালানোর পর প্রায় আট লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়েন খায়রুল। পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে একসময় দোকানে থাকা ফ্রিজটি মাসে ৩০০ টাকায় একজনের কাছে ভাড়া দেন। তখন ধারদেনার চাপে তাঁর জীবন কঠিন হয়ে উঠেছিল।
এরপর নতুনভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেন তিনি। বরিশাল কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) থেকে ফ্রিজ মেরামতের কাজ শেখেন। ২০১৯ সালে নিজের উদ্যোগে আরও তিনটি পুরোনো ফ্রিজ কিনে সেগুলো মেরামত করে ভাড়া দেওয়া শুরু করেন।
সেখান থেকেই ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাঁর ব্যবসা। গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী একের পর এক ফ্রিজ যুক্ত করেন সংগ্রহে। বর্তমানে তাঁর কাছে প্রায় চার শতাধিক ফ্রিজ রয়েছে, যেগুলো বিভিন্ন ব্যক্তি ও পরিবারের কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের জন্য কম খরচে ফ্রিজ ব্যবহারের সুযোগ
খায়রুলের ব্যবসার অন্যতম দিক হলো তুলনামূলক কম খরচে ফ্রিজ ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের অনেকের পক্ষে ব্যক্তিগতভাবে ফ্রিজ কেনা সম্ভব হয় না। তাঁদের জন্য কয়েকজন মিলে একটি ফ্রিজ ভাড়া নেওয়ার ব্যবস্থা বেশ সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।
খায়রুল জানান, ফ্রিজ ভাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন তাঁর প্রধান লক্ষ্য নয়। প্রতিটি ফ্রিজের বিপরীতে গ্রাহকের কাছ থেকে এক হাজার টাকা জামানত নেওয়া হয়। ফ্রিজ ফেরত দেওয়ার সময় গ্রাহককে সেই টাকা ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
একসময় বরিশাল নগরীতে ভাড়া বাসায় থাকতেন খায়রুল। তবে ব্যবসায় সফলতা আসার পর বর্তমানে কাশিপুর এলাকায় কোটি টাকা ব্যয়ে বাড়ি নির্মাণ করছেন তিনি।
পুরোনো ফ্রিজের ব্যবসায় কর্মসংস্থানও তৈরি হয়েছে
খায়রুলের সঙ্গে কাজ করছেন জাহিদ, আফপান, বিপ্লব, রাহাত ও রিফাত। তাঁদের মতে, পুরোনো ফ্রিজ কিনে মেরামত করে ভাড়ার ব্যবসা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে খায়রুল একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ তৈরি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র সাত বছরের মধ্যে ব্যবসাটি অনেক বড় হয়েছে। একই সঙ্গে এই সেবা থেকে উপকৃত হচ্ছেন শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন পরিবারের মানুষ।
শিক্ষার্থী ফারজানা আক্তার জানান, তাঁরা কয়েকজন মিলে মাসে ৫০০ টাকা ভাড়ায় একটি ফ্রিজ ব্যবহার করছেন। দীর্ঘদিন ধরে এভাবে ফ্রিজ ব্যবহারের ফলে তাঁদের সুবিধা হয়েছে। কম খরচে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ায় জীবনযাত্রাও সহজ হয়েছে বলে জানান তিনি।
নগরীর কাউনিয়া এলাকার বাসিন্দা মৌ ইসলাম বলেন, ফ্রিজ কেনার মতো আর্থিক সামর্থ্য না থাকায় তিনি ভাড়ায় ফ্রিজ ব্যবহার করছেন। কয়েকশ টাকা খরচ করেই প্রয়োজনীয় সুবিধা পাচ্ছেন।
বরিশাল সচেতন নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব ডা. মিজানুর রহমানের মতে, খায়রুলের এই উদ্যোগ ব্যবসার পাশাপাশি সামাজিকভাবেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। এতে একদিকে তাঁর পরিবারের আয়ের ব্যবস্থা হয়েছে, অন্যদিকে আর্থিক সংকটে থাকা শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হচ্ছেন।









