সীমান্তের শূন্যরেখায় নারী-শিশুদের ঠেলে দেওয়ার ঘটনা ঘিরে ফের প্রশ্ন উঠেছে—আইনের চোখে এভাবে মানুষকে পাঠানো কতটা বৈধ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার বাঙ্গাবাড়ি সীমান্তে গভীর রাতে নারী ও শিশুসহ ২৮ জনকে ঠেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। ওপারে ভারতের পাকুড় ও মালদাহ—এ দুই অংশের দিকে তাদের ঠেলে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে ঢুকতে বাধা পাওয়ায় টানা দুদিন শূন্যরেখায় আটকে থাকতে হয়। পরে বিএসএফ তাদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
শূন্যরেখায় আটকে থাকা ছাড়া উপায় নেই

ঘটনার পর সীমান্তজুড়ে মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগের মূল সুর, পুশ-ইন প্রচেষ্টা রুখে দিলে শূন্যরেখায় আটকে পড়া ছাড়া আর কোনো বাস্তব উপায় থাকে না ওই মানুষদের। রোদ-বৃষ্টি, খোলা আকাশ—এই অবস্থাই তাদের ঠিকানা হয়ে ওঠে বলে বর্ণনা করেছেন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।
কাগজপত্র ছাড়াই ঠেলে দেওয়া—আইন কী বলছে
মানবাধিকার কর্মীদের বক্তব্য, দলে থাকা ব্যক্তিদের পরিচয় ও নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার মতো নথি তাদের কাছে থাকে না। আবার প্রমাণিত নয়—তারা ভারতীয় কি বাংলাদেশি। তবু বৃদ্ধ, শিশু এবং গর্ভবতী নারীর মতো দুর্বল মানুষদেরও শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া হয়। এ ধরনের পদক্ষেপকে অমানবিক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তাদের মতে, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের মানদণ্ড অনুযায়ী জোর করে একদিক থেকে অন্যদিকে ঠেলে দেওয়া—বিশেষত যেখানে যাচাই, বিচার্য প্রক্রিয়া এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তন কাঠামো অনুপস্থিত—সেখানে নীতিগতভাবেই অবৈধতার প্রশ্ন ওঠে।
বিজিবি জানাচ্ছে, পুশ-ইন ঠেকাতে তৎপরতা বাড়ছে
সীমান্তে উত্তেজনা কমছে না—এমন চিত্রও উঠে এসেছে। বিজিবি-বিএসএফের মধ্যে পতাকা বৈঠক, উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় এবং সীমান্ত এলাকার মানুষ মিলে বিএসএফ সদস্যদের ধাওয়া করার মতো ঘটনাও একাধিকবার উল্লেখ করা হয়। এই পরিস্থিতিতে বিজিবি নিজেদের অবস্থান কঠোর রাখছে।
জানা গেছে, চলতি বছর বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তে প্রায় ১২০টি পুশ-ইন চেষ্টা বিজিবি ঠেকিয়েছে। এসব চেষ্টা ঠেকানোর মাধ্যমে প্রায় ৯শ মানুষকে শূন্যরেখায় অবৈধভাবে ঠেলে পাঠানোর ঝুঁকি তৈরি হওয়া থেকে বিরত রাখা হয়েছে বলে বলা হয়েছে। আরও তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিজিবি বিএসএফের পুশ-ইন কার্যক্রমে মোট ২ হাজার ৩৫৬ জনকে আটক করেছে—বাংলাদেশি, ভারতীয় এবং বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকসহ। পরে তাদের মধ্যে ২ হাজার ১৬৫ জনকে থানায় হস্তান্তর করা হয়।
কূটনৈতিক পথে না গিয়ে কেন—টানাপোড়েনের মধ্যেও প্রশ্ন
বিশেষজ্ঞদের এক অংশ বলছে, রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামা যেমনই হোক, সীমান্তে গোপনে বা কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ছাড়াই মানুষকে ঠেলে দেওয়া হলে আন্তর্জাতিক দায়ও বাড়ে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে এক দফা পুশ-ইনের ঘটনা ঘটেছিল বলেও উল্লেখ রয়েছে। এরপরও পরিস্থিতি থামেনি—এমন অভিযোগ উঠেছে।
চলতি বছরের ৮ জুন কলকাতায় এক দলীয় অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হোল্ডিং সেন্টার প্রসঙ্গে বক্তব্য দেন এবং বাংলাদেশে পাঠানো সংখ্যার কথাও বলেন। তবে বিজিবির দেওয়া তথ্যের সঙ্গে মিল না থাকার দিকেও ইঙ্গিত আছে। সীমান্ত বাস্তবতা যেভাবে বর্ণিত হচ্ছে, সেখানে প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ—সীমান্তে পুশ-ইন কি মানবাধিকারের ন্যূনতম মান ধরে রাখে, নাকি পরিস্থিতিকে অমানবিক করে তোলে?
মানবাধিকার কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মূল অবস্থান: পুশ-ইনকে অমানবিক এবং আন্তর্জাতিক আইনসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের আইনে অবৈধ বলে দেখা হচ্ছে।
প্রশ্ন-উত্তর
১) কাদের ঠেলে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ?
অভিযোগ অনুযায়ী নারী-শিশু, বৃদ্ধ এবং গর্ভবতী নারীসহ অনেকেই থাকে দলে।
২) বিজিবির ভূমিকা কী?
বিজিবি পুশ-ইন প্রচেষ্টা রুখতে সীমান্তে তৎপরতা চালিয়ে আসছে বলে বলা হয়েছে।
৩) আইনগত প্রশ্নটা কোথায়?
নথি-যাচাই ছাড়া মানুষকে শূন্যরেখায় ঠেলে দেওয়া—মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডে অবৈধ বলে দাবি করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: এই বিভাগের সর্বশেষ খবর
সূত্র: jagonews24.com









