GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / লাইফ স্টাইল / আইকিউ বাড়ানোর সহজ উপায় আছে? গবেষণায় যা জানা গেল

আইকিউ বাড়ানোর সহজ উপায় আছে? গবেষণায় যা জানা গেল

আইকিউ কি সারাজীবন একই থাকে? দীর্ঘদিন বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, মানুষের বুদ্ধিমত্তা অনেকটাই জন্মগত। একবার আইকিউ নির্ধারিত হলে তা খুব বেশি বদলায় না।

তবে সাম্প্রতিক কয়েক দশকের গবেষণা এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স, শিক্ষা, পরিবেশ ও প্রশিক্ষণের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বদলাতে পারে। বিশেষ করে শৈশব ও কৈশোরে এই পরিবর্তন বেশি স্পষ্ট।

তবে প্রতিদিন কয়েকটি ধাঁধা সমাধান করলেই আইকিউ অনেক বেড়ে যাবে, এমনটা নয়। বিষয়টি আরও জটিল।

সৃজনশীল প্রশিক্ষণে আইকিউ পরিবর্তন

১৯৭০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়ার শিক্ষাবিদ ও মনোবিজ্ঞানী রাডিভয় কভাশচেভ শিক্ষার্থীদের নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি পরীক্ষা চালান।

সার্বিয়ার একটি ছোট শহরের দুটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নেয়। পরীক্ষামূলক দলে ছিল ১৪৯ জন। নিয়ন্ত্রণ দলে ছিল ১৪৭ জন

পরীক্ষামূলক দলের শিক্ষার্থীদের সপ্তাহে অন্তত একবার বিশেষ ‘সৃজনশীল সমস্যা সমাধান’ ক্লাস করতে হতো।

ক্লাসে প্রচলিত পদ্ধতির বাইরে চিন্তা করতে শেখানো হতো। একটি সমস্যার একাধিক সমাধান বের করতে বলা হতো।

মনোবিজ্ঞানে একে বলা হয় ‘ডাইভারজেন্ট থিংকিং’ বা বহুমুখী চিন্তা।

এভাবে প্রশিক্ষণ চলে টানা তিন বছর।

১৫ বছর বয়সে প্রথমবার শিক্ষার্থীদের আইকিউ পরীক্ষা করা হয়। তখন নিয়ন্ত্রণ দলের শিক্ষার্থীরা কিছুটা এগিয়ে ছিল।

তিন বছর পর আবার পরীক্ষা নেওয়া হয়। তখন চিত্র বদলে যায়।

পরীক্ষামূলক দলের শিক্ষার্থীদের ফল উল্লেখযোগ্যভাবে ভালো হয়।

১৯ বছর বয়সে চূড়ান্ত পরীক্ষায় দেখা যায়, প্রশিক্ষণ নেওয়া শিক্ষার্থীদের আইকিউ নিয়ন্ত্রণ দলের তুলনায় গড়ে ১০ পয়েন্ট বেশি বেড়েছে।

কিছু নির্দিষ্ট বুদ্ধি পরীক্ষায় ব্যবধান ছিল ১৫ পয়েন্ট পর্যন্ত।

২০২০ সালে ‘জার্নাল অব ইন্টেলিজেন্স’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে এই গবেষণার তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করেন মনোবিজ্ঞানী লাজার স্ট্যানকভ ও জিহিউন লি

তাদের বিশ্লেষণও দীর্ঘমেয়াদি সৃজনশীল ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশিক্ষণের গুরুত্ব সামনে আনে।

কৈশোরে মস্তিষ্ক ও আইকিউ পরিবর্তন

কৈশোরে আইকিউ পরিবর্তন নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষক ক্যাথি প্রাইস ও তার সহকর্মীরা ২০১১ সালে ‘নেচার’ জার্নালে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন।

গবেষণায় ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ৩৩ জন সুস্থ কিশোর-কিশোরী অংশ নেয়।

শুরুতে তাদের আইকিউ পরীক্ষা করা হয়। একইসঙ্গে মস্তিষ্কের স্ক্যানও নেওয়া হয়।

চার বছর পর আবার পরীক্ষা ও স্ক্যান করা হয়।

ফলাফলে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। কিছু অংশগ্রহণকারীর আইকিউ প্রায় ২০ পয়েন্ট পর্যন্ত বেড়েছিল।

আবার কারও আইকিউ প্রায় একই পরিমাণ কমেও গিয়েছিল।

একজন শিক্ষার্থীর আইকিউ প্রথম পরীক্ষায় ছিল প্রায় ১০০। চার বছর পর তা বেড়ে হয় ১২৭

মস্তিষ্কের স্ক্যানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

গবেষকেরা দেখতে পান, আইকিউ পরিবর্তনের সঙ্গে মস্তিষ্কের ধূসর বস্তুর ঘনত্বের পরিবর্তনের সম্পর্ক রয়েছে।

জটিল কাজ ও শিক্ষার ভূমিকা

মানুষের কর্মপরিবেশও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী স্টিভেন সিসি ও অন্যান্য গবেষকদের কাজ থেকে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

২৫০ জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর ছয় বছর ধরে গবেষণা করা হয়।

যারা কর্মক্ষেত্রে জটিল সম্পর্ক, প্রক্রিয়া বা কঠিন সমস্যা নিয়ে কাজ করেন, তারা সময়ের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারেন।

শিক্ষার সঙ্গেও আইকিউয়ের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

স্টিভেন সিসির গবেষণা অনুযায়ী, প্রতি এক বছর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা মানুষের আইকিউ কয়েক পয়েন্ট বাড়াতে পারে।

ডেনমার্কের তরুণ ও মধ্যবয়সীদের ওপর চালানো একটি বড় গবেষণাতেও একই ধরনের সম্পর্ক দেখা যায়।

সেখানে প্রতি এক বছর অতিরিক্ত শিক্ষার সঙ্গে আইকিউ গড়ে ৪ দশমিক ৩ পয়েন্ট পর্যন্ত বাড়তে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, কয়েক বছর বেশি পড়লেই সবার আইকিউ একই হারে বাড়বে।

ব্রেইন গেম কি আইকিউ বাড়ায়?

ধাঁধা, কুইজ বা নির্দিষ্ট ব্রেইন গেম খেললে সেই কাজের দক্ষতা বাড়তে পারে।

তবে এই উন্নতি যে সামগ্রিক বুদ্ধিমত্তায় ছড়িয়ে পড়বে, তার শক্ত প্রমাণ নেই।

প্রাপ্তবয়স্কদের ওপর ভিডিও গেম নিয়ে করা একটি গবেষণাতেও এমন বিষয় উঠে এসেছে।

অংশগ্রহণকারীরা যে নির্দিষ্ট গেম খেলেছেন বা নির্দিষ্ট ধরনের পড়াশোনা করেছেন, মূলত সেই সংশ্লিষ্ট দক্ষতাতেই উন্নতি করেছেন।

অর্থাৎ কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতায় ভালো হতে চাইলে সেই দক্ষতার অনুশীলন করাই বেশি কার্যকর।

শুধু ব্রেইন গেম খেললেই সামগ্রিক আইকিউ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

পুষ্টির সঙ্গে আইকিউয়ের সম্পর্ক

মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ও পুষ্টির সম্পর্ক নিয়েও গবেষণা হয়েছে।

তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।

কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এভিডেন্স বেসড লিভিং’ ব্লগে লাইলা নামের এক ডিজাইনার নিজের অভিজ্ঞতা লিখেছেন।

তিনি জানান, ২০০৮ সালে তার আইকিউ পরীক্ষার স্কোর ছিল গড়ে ১১৩

পরে কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব বাড়ার পাশাপাশি নিয়মিত ডিএইচএ অয়েল ট্যাবলেট বা সামুদ্রিক শৈবাল থেকে তৈরি পুষ্টিকর তেল গ্রহণের পর তার আইকিউ ১২৮ থেকে ১৩৩-এর মধ্যে পৌঁছায়।

ডিএইচএ মস্তিষ্কের কোষের বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে এটি একজনের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। তাই ডিএইচএ গ্রহণ করলেই সবার আইকিউ একইভাবে বাড়বে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

আইকিউ বাড়ানোর বাস্তবসম্মত পথ

প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় পরিবর্তন সম্ভব। তবে বিষয়টি শিশু-কিশোরদের তুলনায় জটিল।

কোনো নির্দিষ্ট দক্ষতা নিয়মিত অনুশীলন করলে সেই দক্ষতায় উন্নতি করা সম্ভব।

নতুন ভাষা শিখলে ভাষার দক্ষতা বাড়তে পারে। নিয়মিত গণিতের সমস্যা সমাধান করলে গণিতের দক্ষতা বাড়তে পারে।

নতুন কোনো জটিল কাজ শিখলেও সংশ্লিষ্ট চিন্তার দক্ষতা উন্নত হতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, সামগ্রিক আইকিউ একই হারে বেড়ে যাবে।

গবেষণার ফলাফল থেকে কোনো সহজ ‘আইকিউ বাড়ানোর ফর্মুলা’ পাওয়া যায় না।

তবে মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন কিছু শেখা, কঠিন সমস্যা সমাধান করা, সৃজনশীলভাবে চিন্তা করা এবং বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে মানসম্মত শিক্ষা ও সহায়ক পরিবেশের গুরুত্ব আরও বেশি।

তবে আইকিউ মানুষের মেধা বা সম্ভাবনার একমাত্র মাপকাঠি নয়।

একটি পরীক্ষার স্কোর দিয়ে একজন মানুষের সৃজনশীলতা, কৌতূহল, সামাজিক দক্ষতা, অধ্যবসায় বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

তাই ‘আমার আইকিউ কত?’ প্রশ্নের পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, ‘আমি কীভাবে আরও ভালোভাবে চিন্তা করতে পারি?’

গবেষণার বর্তমান তথ্য বলছে, বুদ্ধিমত্তাকে পাথরে খোদাই করা কোনো স্থির সংখ্যা হিসেবে দেখার কারণ নেই।

বয়স, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, পরিবেশ ও অনুশীলনের সঙ্গে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতায় পরিবর্তন আসতে পারে।

Social Icons