ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে দিল্লিতে দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভের প্রস্তুতি নিয়েছে তরুণদের সংগঠন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীতে নতুন করে আন্দোলনের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আগের দিনের বিক্ষোভে আটক সংগঠনটির তিন শীর্ষ নেতাকে আদালত মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে এবং সংগঠনটির আরও দুই নেতা সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে শনিবার দিল্লিতে পৌঁছানোর পর উড়োজাহাজ থেকেই আটক করা হয়। রোববার সকালে তাঁদের দিল্লি ক্যান্টনমেন্টের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে হাজির করা হলে এক বছরের জন্য শান্তিভঙ্গ হতে পারে, এমন কর্মকাণ্ডে জড়িত না থাকার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়।
সিজেপির আইনবিষয়ক প্রধান রত্না সিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তাঁদের মুক্তির খবর জানিয়ে শর্তটির কথা উল্লেখ করেন।
ধ্রুব রাঠিও মুক্তি পেয়েছেন
বিক্ষোভের ঘটনায় আটক হয়েছিলেন ইউটিউবার ধ্রুব রাঠিও। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁকে ভবিষ্যতে আর কোনো বিক্ষোভে অংশ না নেওয়ার শর্তে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। তবে ওই কর্মকর্তার নাম প্রকাশ করা হয়নি।
শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে দুই হাজারের বেশি মানুষকে আটক করার কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। তাঁদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, অভিনেতা, আন্দোলনকর্মী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত ব্যক্তিরাও ছিলেন। আটক ব্যক্তিদের অধিকাংশকে শনিবার গভীর রাতেই ছেড়ে দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার, খুলেছে মেট্রো স্টেশন
শনিবার বিক্ষোভকারীদের যন্তর মন্তরে জড়ো হওয়া ঠেকাতে দিল্লির কেন্দ্রীয় এলাকায় কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েনের পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয়।
রোববারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন রয়েছেন। তবে মেট্রো স্টেশনগুলো আবার খুলে দেওয়া হয়েছে এবং মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবাও চালু হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে শনিবার বিক্ষোভকারীরা এক জায়গায় জড়ো হতে পারেননি। পরে শহরের বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিবাদ জানান তাঁরা।
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের সমালোচনা
বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সমালোচনা করেছেন বিরোধী দল ও প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের সমালোচকেরা। জাতিসংঘের একটি সংস্থা শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের অবস্থানকে ‘বেছে বেছে’ নেওয়া বলে মন্তব্য করেছে। মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য, এ ধরনের বিবৃতি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপ।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে মূল বিরোধ
সিজেপির আন্দোলনের প্রধান দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ।
বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকায় কারসাজির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের তথ্যের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যাচাই কার্যক্রমে প্রায় ১৩ কোটি নাম বাদ পড়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ মানুষ অন্যত্র চলে গেছেন এবং প্রায় ৩ কোটি মানুষকে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিমসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটাররা তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে বাদ পড়া নামগুলোর বিস্তারিত তথ্য, যাচাইপ্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আপিলের সুযোগ সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রয়োজন।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি প্রতিবেদনে নির্বাচন কমিশনের দুই কমিশনারের ভোটার তালিকা সংশোধন, নিবন্ধন পদ্ধতি ও ডিজিটাল ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগের কথা প্রকাশিত হয়েছিল বলে মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন অবশ্য বলেছে, অভ্যন্তরীণ আলোচনায় ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক এবং তারা কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষ নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আন্দোলনকে ‘সিজন ২’ বলছে সিজেপি
ককরোচ জনতা পার্টি শুরুতে অনলাইনে ব্যঙ্গ-রসিকতাভিত্তিক উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতি পায়। পরে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের বিরুদ্ধে আন্দোলনের মাধ্যমে সংগঠনটি আলোচনায় আসে। ওই আন্দোলনের পর ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের ঘটনাও মূল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এবার ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রতিবাদকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘সিজন ২’ হিসেবে তুলে ধরছে সিজেপি। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় সংস্কার এবং অভিযোগের জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তাঁরা।
রোববারের কর্মসূচিতে কতজন অংশ নেবেন এবং প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেবে, তা নিয়ে পরিস্থিতির দিকে নজর রয়েছে। ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার ও প্রশাসনের ভূমিকা এখন ভারতের রাজনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।









