সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথি। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খামিস মুশাইতে অবস্থিত কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার কথাও জানিয়েছে তারা। তবে এসব হামলার সাফল্য সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ তথ্য জানান।
সাম্প্রতিক হামলার পর সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সৌদি কর্মকর্তা জানান, হামলার আগাম সতর্কবার্তা দিতে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন ব্যর্থ হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এক হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছানোর ঘটনায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
হুথি কারা?
হুথিরা ইয়েমেনের একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। তাদের সংগঠনের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’। প্রতিষ্ঠাতা নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকে আন্দোলনটি হুথি নামে পরিচিতি পায়।
১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে গোষ্ঠীটির উত্থান ঘটে। একসময় এ সম্প্রদায় ইয়েমেনের শাসনব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও পরবর্তী সময়ে তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে যায়।
প্রথম দিকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে একাধিক গেরিলা সংঘর্ষে জড়ায় হুথিরা। প্রতিবেশী সৌদি আরবের সঙ্গেও তাদের সীমান্ত সংঘাত হয়।
২০১১ সালের আরব বসন্তের গণবিক্ষোভে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর উত্তরাঞ্চলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে গোষ্ঠীটি। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে শুরু হওয়া রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়াও তারা প্রত্যাখ্যান করে।
২০১৪ সালে রাজধানী সানা দখল করে হুথিরা। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলের এডেনে সরে যেতে বাধ্য হয়। বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত কেন?
ইয়েমেনে হুথিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব, ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এবং সৌদি সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বিগ্ন রিয়াদ। এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে।
জোটের ঘোষিত লক্ষ্য ছিল হুথিদের হটিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনর্বহাল করা এবং রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া। তবে সামরিক অভিযান ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জোটের বিভিন্ন সদস্যের বিমান হামলা এবং ইয়েমেনের বিভিন্ন পক্ষের সংঘর্ষে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়। দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ড ও দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের কারণে কোনো পক্ষই পুরো দেশটির ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
হুথিরা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে। একই সঙ্গে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা বাড়িয়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালায়।
দীর্ঘ সংঘাতের পর ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোতে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লোহিত সাগরে হামলা, বিশ্ববাণিজ্যে প্রভাব
২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানানোর কথা বলে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা শুরু করে হুথিরা। ইসরাইল লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে তারা।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেব প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটে। অনেক জাহাজকে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় ও সময় বেড়ে যায়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ ও মোখা বন্দর শহর দখল করে। তবে এ দাবির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
বাব আল-মানদেব প্রণালির আশপাশে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হলে সৌদি আরবসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর জ্বালানি পরিবহন ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সৌদি আরবের গুরুত্ব
সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ। দেশটির অর্থনীতি এবং রপ্তানি আয়ের বড় অংশ জ্বালানি খাতের ওপর নির্ভরশীল।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ সৌদি আরব থেকে আসে। দেশটির কাছে বিশ্বের প্রমাণিত তেল মজুতের আনুমানিক ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ রয়েছে। দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন ও রপ্তানি আয়ের ক্ষেত্রেও তেল-গ্যাস খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এ কারণে সৌদি আরবের তেল স্থাপনা, বন্দর, বিমানবন্দর কিংবা পরিবহনব্যবস্থায় বড় ধরনের হামলা হলে তার প্রভাব দেশটির অর্থনীতির বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ ও দামের ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে।
হুথিরা কতটা শক্তিশালী?
হুথিদের সামরিক সক্ষমতার অন্যতম ভিত্তি তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনভান্ডার। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাদের হাতে ট্যাংক, সাঁজোয়া যান, ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে গোষ্ঠীটির সশস্ত্র সদস্যসংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ বলে অনুমান করা হয়েছিল। তবে এটি পুরোনো হিসাব; বর্তমান সদস্যসংখ্যা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য হালনাগাদ তথ্য এখানে নেই।
হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেনের বাইরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানার সক্ষমতা দেখিয়েছে। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনাও তাদের দূরপাল্লার আক্রমণ পরিচালনার সামর্থ্যের পরিচয় দেয়।
ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থানও তাদের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ রয়েছে গোষ্ঠীটির।
ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ?
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক বলয়ের অংশ হিসেবে হুথিদের সমর্থন করে। এই বলয়ের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের কয়েকটি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে। এ কাজে হিজবুল্লাহও ভূমিকা রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ককে অন্য আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্কের সঙ্গে পুরোপুরি এক করে দেখা যায় না। হুথিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিজেদের চূড়ান্ত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকার করে না। ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থও তাদের কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
হুথিরা নিজেদের ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করার বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, তারা নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করে।
হুথিদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কঠিন কেন?
হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল ও বিস্তীর্ণ মরুভূমি তাদের অবস্থান গোপন রাখা এবং দ্রুত স্থান পরিবর্তনের সুযোগ দেয়।
এ ছাড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সমন্বিত ব্যবহার আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করা হলে সব হামলা শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হতে পারে।
প্রতিবেদনে হুথিদের ব্যবহৃত অস্ত্রের মধ্যে ‘প্যালেস্টাইন-২’, ‘তুফান’, ‘বুরকান’ ও ‘বদর’ সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্যালেস্টাইন-২-এর হাইপারসনিক সক্ষমতা নিয়ে দাবি রয়েছে। অন্যদিকে, তুফানকে ইরানের ‘ঘাদর’ ক্ষেপণাস্ত্রের পরিবর্তিত সংস্করণ বলে ধারণা করা হয়। বুরকান ও বদর সিরিজের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রের উৎস ইরান বলে মনে করা হয়।
তবে এসব অস্ত্রের প্রকৃত সক্ষমতা, উৎপত্তি ও ব্যবহারসংক্রান্ত সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার দাবি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। এর প্রভাব শুধু ইয়েমেন ও সৌদি আরবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক নৌপথ, বাণিজ্য এবং জ্বালানি সরবরাহের ওপরও পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: দৈনিক যুগান্তর ও প্রতিবেদনে উল্লেখিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম








