রাজধানীর খিলক্ষেতে গৃহবধূ মুক্তা ইসলামকে শিকল দিয়ে খাটের সঙ্গে বেঁধে বেল্ট দিয়ে নির্যাতনের একটি ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠানোর দুই দিন পর তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মুক্তার পরিবারের অভিযোগ, নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করে লাশ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় তার স্বামীসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং প্রধান আসামি সোহেল শিকদারকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদার গত ১ সেপ্টেম্বর তার ভাই তানভীর রহমানের মুঠোফোনে প্রায় তিন মিনিটের একটি ভিডিও পাঠান। সঙ্গে লিখেছিলেন, ‘তোমার বোনকে নিয়ে যাও।’
ভিডিওতে দেখা যায়, মুক্তার পায়ে শিকল বাঁধা এবং তাকে খাটের সঙ্গে বেঁধে চামড়ার বেল্ট দিয়ে একের পর এক আঘাত করা হচ্ছে। তার শরীরেও আঘাতের দাগ দেখা যায়।
নির্যাতনের সময় সোহেলকে বলতে শোনা যায়, ‘কথা ক, কথা ক, তোরে আজ পিটাইয়া মাইরা ফালামু।’ জবাবে মুক্তা বলেন, ‘আমি কিছু করিনি। আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’
দুই সন্তানের কান্নার মধ্যেও নির্যাতন
নির্যাতনের সময় পাশের কক্ষে ছিল মুক্তার দুই সন্তান। তাদের কান্না শুনে মুক্তা স্বামীকে বলেন, ‘আমাকে মারবা ঠিক আছে, শুধু দুই বাচ্চারে ঘুম পাড়িয়ে আসি।’
তবে এরপরও নির্যাতন বন্ধ হয়নি বলে ভিডিওতে দেখা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতারের পর সোহেলের জব্দ করা মুঠোফোনেও ওই নির্যাতনের ভিডিওটি পাওয়া গেছে।
ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার, মামলা
খিলক্ষেতের ৫ নম্বর সড়কের ৩৯ নম্বর বাড়ির তৃতীয় তলার ফ্ল্যাট থেকে বৃহস্পতিবার মুক্তার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়।
মুক্তার ভাই তানভীর রহমান বাদী হয়ে খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন। মামলায় মুক্তার স্বামীসহ চারজনকে আসামি করা হয়েছে।
খিলক্ষেত থানার ওসি মো. সোহরাব আল হোসাইন জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সোহেল মুক্তাকে মারধরের কথা স্বীকার করেছেন। তবে যেদিন মুক্তা ফাঁস দিয়েছেন, সেদিন তাকে মারধর করেননি বলে দাবি করেছেন তিনি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, মুক্তাকে ফাঁস দেওয়ার দুই দিন আগে মারধর করেছিলেন সোহেল।
তিন লাখ টাকা চাওয়ার অভিযোগ
পুলিশ জানিয়েছে, কয়েক মাস আগে মুক্তার ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চেয়েছিলেন সোহেল। টাকা দিতে দেরি হওয়ায় মুক্তাকে মারধর করা হতো বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার।
এ ছাড়া বিয়ের পর থেকেই স্বামীর সঙ্গে মুক্তার কলহ চলছিল। বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের সন্দেহ এবং যৌতুকের জন্যও তাকে নির্যাতন করা হতো বলে পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
মুক্তা অবশ্য এসব নির্যাতনের কথা পরিবারকে তেমন কিছু বলতেন না বলে স্বজনরা জানিয়েছেন।
ব্যবসায় লোকসানের পর বাড়ে মনোমালিন্য
মুক্তার গ্রামের বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জ উপজেলার দুধাল ইউনিয়নের শরশী গ্রামে। একই এলাকার সোহেল শিকদারের সঙ্গে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়।
বিয়ের পর তারা খিলক্ষেতে বসবাস করতেন। সোহেল প্রথমে মুদি দোকান করতেন। পরে এমব্রয়ডারি ব্যবসায় যুক্ত হন। ব্যবসায় ভালো করতে না পারার পর স্ত্রীর সঙ্গে তার মনোমালিন্য বেড়ে যায় বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন।
মায়ের শেষ ঠিকানায় দুই শিশু
মুক্তার মৃত্যুর পর তার পাঁচ বছরের ছেলে সাফওয়ান ও চার বছরের মেয়ে তাসফিয়া মায়ের শেষ ঠিকানার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। স্বজনদের আহাজারির মধ্যে তারাও কাঁদছিল।
বাকেরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন চন্দ্র পাল জানান, উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুদের নগদ টাকা ও খাদ্যসামগ্রী দিয়েছেন। পরিবারটির প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসন পাশে থাকবে বলেও জানান তিনি।
এদিকে মুক্তার স্বামী সোহেল শিকদারের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।




