চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির নানা অভিযোগ উঠেছে জাতীয়তাবাদী কৃষক দলের চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীরের বিরুদ্ধে। বাদাম বিক্রেতা থেকে শুরু করে হোটেল ব্যবসায়ী, জেলে, পরিবহণ শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও তার নামে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগ একেবারে অস্বীকার করেছেন আলমগীর।
অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উত্তর ও দক্ষিণ পতেঙ্গা এলাকায় চাঁদাবাজি ও দখলবাজির প্রভাব বিস্তার করেন আলমগীর। তার সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ডে সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে তার ভাই ও স্বেচ্ছাসেবক দলের পতেঙ্গা থানা সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম এবং পতেঙ্গা থানা ছাত্রদলের সভাপতি রাব্বী হোসেন রিমনের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ অভিযোগ করলেও অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
খেয়াঘাট দখলের অভিযোগ
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আলমগীরের নজর পড়ে পতেঙ্গার কর্ণফুলী নদীর ১১ নম্বর খেয়াঘাটে। অভিযোগ রয়েছে, তার লোকজন ইজারাদারের লোকজনকে মারধর করে সরিয়ে দিয়ে ঘাটটি দখলে নেয়।
সেখানে খাস কালেকশন থেকে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হতো বলে অভিযোগ করা হয়েছে। প্রায় ছয় মাস পর অভিযোগের ভিত্তিতে সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান চালিয়ে অবৈধভাবে চাঁদা আদায়ের সময় কয়েকজনকে আটক করেন।
ইজারাদার মিজানুর রহমানের দাবি, পরে আলমগীর খেয়াঘাটের দখল ছেড়ে দেওয়ার মুচলেকা দিয়ে আটক ব্যক্তিদের ছাড়িয়ে আনেন। তার অভিযোগ, ওই ছয় মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকা আদায় করা হয়েছে।
হোটেল ব্যবসায়ীদের কাছেও চাঁদার অভিযোগ
পতেঙ্গা ও নেভাল এলাকায় থাকা ১৬টি হোটেল নিয়েও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আলমগীরের লোকজন বিভিন্ন সময়ে হোটেলে গিয়ে চাঁদা দাবি করতেন এবং কখনো কখনো তালা লাগিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হতো।
প্রতিটি হোটেলের কাছে এককালীন ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা এবং মাসে ৫ হাজার টাকা করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। ব্যবসা চালিয়ে যেতে অনেক হোটেল মালিকই এসব দাবি মেনে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ খাত থেকে এককালীন প্রায় ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। দলীয় অনুষ্ঠান উপলক্ষেও বিভিন্ন হোটেল থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
জমি দখল ও সাইনবোর্ড ঝোলানোর অভিযোগ
টানেল রোডের মুখ থেকে চরপাড়া পর্যন্ত প্রায় চার একর জায়গা ব্যবসায়ী আবুল হোসেনের বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এককালীন ২ কোটি টাকা দিয়ে জায়গাটি ভাড়া নেওয়ার কথা বলে আলমগীর সেটি দখলে নেন। পরে মালিককে ২০ লাখ টাকা দেওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ না করে জায়গাটি তৃতীয় পক্ষের কাছে ভাড়া দিয়ে অর্থ আদায় করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষিণ পতেঙ্গা মৌজায় ব্যবসায়ী রাশেদ আলীর জায়গায় নিজের নাম দিয়ে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে মালিকানা দাবি করার অভিযোগও রয়েছে।
রাশেদের অভিযোগ, তিনি ঝামেলা এড়াতে আলমগীরের কাছে ১ লাখ টাকার একটি চেক পাঠিয়েছিলেন। পরে একই জায়গায় আবার সাইনবোর্ড ঝোলানো হয়, তবে এবার সেখানে পতেঙ্গা থানা ছাত্রদলের সভাপতি রাব্বী হোসেন রিমনের নাম ব্যবহার করা হয়।
এ ঘটনায় রাশেদ পুলিশ কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগটি তদন্তের জন্য পতেঙ্গা থানায় পাঠানো হয়েছে।
কনটেইনার পরিবহণেও চাঁদার অভিযোগ
কাটগড় এলাকার দুটি কনটেইনার ডিপো নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ডিপোর মালিকপক্ষের কাছ থেকে বিনা মূল্যে ১০টি সিরিয়াল নিয়ে তা ট্রাক ও লরির মালিকদের কাছে বিক্রি করে অর্থ আদায় করা হতো।
কনটেইনার পরিবহণের জন্য সিরিয়াল প্রয়োজন হওয়ায় এভাবে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
জেলেদের কাছ থেকেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ
ইলিশ মৌসুমে পতেঙ্গা উপকূলের জেলেরা সাগরে মাছ ধরতে যান। মাছ ধরার জন্য সাগরে বাঁশ বা মার্কিং দিয়ে নির্দিষ্ট এলাকা চিহ্নিত করা হয়, যাকে স্থানীয়ভাবে ফাঁড় বলা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ফাঁড়ের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জেলেদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করা হয়।
এ ছাড়া বিমানবাহিনীর কাছ থেকে ইজারা নিয়ে পতেঙ্গায় মাছ চাষ করা কয়েকটি প্রকল্প নিয়েও বিরোধের অভিযোগ রয়েছে। জামাল উদ্দিন রাজুর দাবি, আলমগীর দুই অংশীদারকে নিজের পক্ষে নিয়ে প্রকল্পগুলো জোরপূর্বক দখল করেছেন।
টমটম ও পরিবহণ খাতেও চাঁদার অভিযোগ
পতেঙ্গার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ রুটে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার টমটম ও এইচপাওয়ার গাড়ি চলাচল করে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি গাড়ি ভর্তি বা নতুনভাবে যুক্ত করার ক্ষেত্রে আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা এবং মাসে দেড় হাজার টাকা করে আদায় করা হয়।
এ ছাড়া পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতের প্রায় ৪০০ দোকান থেকেও নিয়মিত চাঁদা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
চোরাচালান নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পতেঙ্গার বিভিন্ন এলাকায় চোরাচালানের তৎপরতা বাড়ে। মিয়ানমারে বিভিন্ন পণ্য যাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশে মাদকসহ বিভিন্ন পণ্য আসার অভিযোগ রয়েছে।
বিদেশি জাহাজ থেকে মদ-বিয়ার নামানো এবং কালোবাজারে তেল বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব চোরাচালান কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ আলমগীর ও তার লোকজনের হাতে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদনে কোনো সরকারি তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত উল্লেখ করা হয়নি।
আলমগীরের বক্তব্য
চট্টগ্রাম মহানগর কৃষক দলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ আলমগীর তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি নির্যাতিত হয়েছেন এবং ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই পুলিশের হাতে আটক হয়েছিলেন। তার ভাষ্য, পতেঙ্গার বিভিন্ন খাতে আগে আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি করত।
হোটেল চাঁদাবাজি, জায়গা দখল ও ঘাট দখলের অভিযোগকে মিথ্যা দাবি করে আলমগীর বলেন, বরং তিনি হোটেল ব্যবসায়ীদের কাউকে চাঁদা না দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
ব্যবসায়ী রাশেদের জায়গা নিয়ে তিনি বলেন, জায়গাটি বিরোধপূর্ণ এবং এর সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। ছাত্রদল নেতা রিমনের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও দাবি করেন তিনি।






