চাকরি জীবনে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অসদাচরণের অভিযোগে একাধিকবার আলোচনায় আসা প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েল এবার খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হয়েছেন। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী পদ থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি দেওয়া হয়েছিল এবং চার বছরের জন্য তার পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়েছিল।
জুয়েল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। পরে নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেলেও দুর্নীতির অভিযোগে পদাবনতি হয়। এরপর অভ্যুত্থানের পর তিনি উপ-প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান।
২,৫৯৮ কোটি টাকার প্রকল্পের দায়িত্ব
খুলনা ওয়াসার ২ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকার পানি সরবরাহ প্রকল্প ফেজ-২-এর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই জুয়েলকে ঘিরে আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করেই গত ২৮ জুন তিনি খুলনা ওয়াসার উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে নিয়োগ পান। এরপর প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর জুয়েলকে ওই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক প্রকৌশলী বলেন, প্রকল্পটি জটিল প্রকৌশল জ্ঞাননির্ভর হলেও এ ধরনের কাজের কোনো অভিজ্ঞতা জুয়েলের নেই। ফলে কী ক্ষমতাবলে তিনি এত বড় প্রকল্পের দায়িত্ব পেলেন, তা নিয়ে ওয়াসায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে।
দুর্নীতির অভিযোগে হয়েছিল পদাবনতি
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় একাডেমিক ভবন নির্মাণের পর ভবনে হাঁটাচলার সময় কম্পন দেখা দেয়। এর কারণ অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
খুবি ও খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) প্রবীণ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত কমিটি ভবনের ছাদের চারটি স্থানে স্ল্যাব কেটে পরীক্ষা করে অনিয়ম দেখতে পায়।
তদন্তে দেখা যায়, নকশা অনুযায়ী ছাদের কংক্রিটের পুরুত্ব সাড়ে ৫ ইঞ্চি থাকার কথা থাকলেও কোথাও তা ছিল মাত্র ৩ ইঞ্চি এবং কোথাও ৩ দশমিক ৭৫ ইঞ্চি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলীরা অনিয়মে বাধা না দিয়ে ঠিকাদারের পক্ষে বিল ছাড়ের সুপারিশ করেছিলেন। পরে সাড়ে ৫ ইঞ্চি কংক্রিট থাকার কথা উল্লেখ করে পুরো অর্থ পরিশোধ করা হয়।
দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জুয়েলসহ কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়। জুয়েলকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে সহকারী প্রকৌশলী পদে পদাবনতি করা হয় এবং চার বছরের জন্য পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়।
শাস্তি বাতিল ও নতুন পদোন্নতির অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাসোসিয়েশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশের (অ্যাব) সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও বর্তমান রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রিয়াজুল ইসলামের সঙ্গে জুয়েলের ঘনিষ্ঠতার কথা বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অভ্যুত্থানের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে জুয়েলের আগের শাস্তি বাতিল করা হয়। এরপর ২০২৫ সালে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়।
এরপর তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানো হয়, যা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে অন্য সংস্থায় প্রেষণে পাঠানোর প্রথম ঘটনা বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদবির ও হস্তক্ষেপের অভিযোগ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন দপ্তরে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বদলি ও পদায়নে হস্তক্ষেপ এবং আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার জন্য তদবির করার অভিযোগ ওঠে জুয়েলের বিরুদ্ধে।
২০২৫ সালের ২৬ জুন খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি এসএম শফিকুল আলম মনা ও সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিন অ্যাব সভাপতি ও আইইবির চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলামকে এ বিষয়ে চিঠি দেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
চিঠিতে অভিযোগ করা হয়, জুয়েল কুয়েটসহ বিভিন্ন প্রকৌশল দপ্তরে গিয়ে হুমকি-ধমকি দিচ্ছেন এবং নিয়োগ ও পদোন্নতিতে অযাচিত হস্তক্ষেপ করছেন। বিভিন্ন অফিসে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার জন্য তদবিরের অভিযোগও তোলা হয়।
তবে আরিফুল ইসলাম জুয়েল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, অভিযোগগুলো ভুয়া এবং তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ভবন নির্মাণের দুর্নীতির অভিযোগের সময় তিনি ভারতে চিকিৎসাধীন ছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।
বড় প্রকল্পের পিডি হওয়ার জন্য নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার চেয়ে যোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ এবং সে কারণেই মন্ত্রণালয় তাকে পিডি করেছে বলে মন্তব্য করেন জুয়েল।
কর্মস্থলে দেরি ও অনুপস্থিতির অভিযোগ
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, কর্মস্থলে দেরিতে উপস্থিত হওয়া ও সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে জুয়েলকে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজিটাল হাজিরার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে পরবর্তী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৪ কর্মদিবসের প্রতিদিনই তিনি দেরিতে অফিসে উপস্থিত হন। এর মধ্যে ৩০ দিন তিনি নির্ধারিত সময়ের আগেই অফিস ত্যাগ করেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে প্রতিদিন গড়ে মাত্র ২ দশমিক ৮৬ ঘণ্টা অফিস করেছেন তিনি।
এ ঘটনায় ৪ মার্চ তাকে আবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।
আগের প্রকল্প পরিচালককে সরানোর অভিযোগ
খুলনা ওয়াসার পানি সরবরাহ প্রকল্পের রুটিন দায়িত্বে ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী রেজাউল ইসলাম। গত ২৬ এপ্রিল তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, অ্যাবের কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে তদবির করে জুয়েল তাকে সরিয়ে দেন। ২৮ জুন ওয়াসায় যোগ দেওয়ার পর জুয়েল প্রকল্পটির পরিচালক হওয়ার চেষ্টা চালান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে ২৯ জুলাই প্রকল্পটির অতিরিক্ত পরিচালকের দায়িত্ব দেওয়া হয় ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহকে। পরে বিভিন্ন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং মন্ত্রণালয়ে তদবিরের মাধ্যমে ফিরোজ শাহকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে জুয়েলের বিরুদ্ধে।
শেষ পর্যন্ত ২ সেপ্টেম্বর প্রকল্পটির দায়িত্ব পান জুয়েল।
নাগরিক সমাজের উদ্বেগ
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, সুপেয় পানি সরবরাহে ব্যর্থতা, বিল নিয়ে ভোগান্তি ও সড়ক খোঁড়াখুঁড়িসহ বিভিন্ন কারণে ওয়াসা অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি সচল করতে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা প্রয়োজন।
তার মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় দুর্নীতি ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে খুলনা ওয়াসার পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে।
এ বিষয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফিরোজ শাহ বলেন, প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ মন্ত্রণালয়ের বিষয়। এ বিষয়ে তার কিছু বলার নেই।






