ওয়ানডে বিশ্বকাপের এক বছরেরও কম সময় বাকি থাকতে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ব্যাটিং কোচের দায়িত্বে পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে আপাতত অন্তর্বর্তীকালীন ব্যাটিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে হাই পারফরম্যান্স বিভাগের কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনকে।
বিশ্বকাপের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এই পরিবর্তন নিয়ে ক্রিকেটাঙ্গনে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও আশরাফুলকে দায়িত্ব থেকে সরানোর নির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি বিসিবি, সাম্প্রতিক ওয়ানডে ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা এই সিদ্ধান্তের সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট হিসেবে সামনে এসেছে।
আশরাফুলের জায়গায় ফিরলেন সালাহউদ্দিন
বাংলাদেশ দলের সঙ্গে আগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে মোহাম্মদ সালাহউদ্দিনের। এর আগে জাতীয় দলের সহকারী কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সে সময় দলের ব্যাটিং ইউনিটের দেখভালের দায়িত্বও ছিল তাঁর হাতে।
গত বছরের নভেম্বরে ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব পান মোহাম্মদ আশরাফুল। এবার তাঁর জায়গায় আবারও দায়িত্বে ফিরলেন সালাহউদ্দিন। তবে আপাতত তাঁকে স্থায়ীভাবে নয়, অন্তর্বর্তীকালীন কোচ হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বকাপ সামনে রেখে দলের ব্যাটিংয়ের উন্নতি ঘটানো এবং পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনাই এখন কোচিং বিভাগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
ব্যাটিং ব্যর্থতা কি পরিবর্তনের বড় কারণ?
সাম্প্রতিক ওয়ানডে ম্যাচগুলোতে বাংলাদেশের ব্যাটিং নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে বড় লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে দলটির ব্যর্থতা চোখে পড়েছে।
জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৭২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে বাংলাদেশ মাত্র ১৭২ রানে অলআউট হয়ে যায়। ফলে ৯৯ রানের বড় ব্যবধানে হারতে হয় দলটিকে।
ম্যাচের পর বাংলাদেশের পেসার তাসকিন আহমেদ ব্যাটারদের ব্যর্থতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ‘আসলে ব্যাটসম্যানদের জেতানো উচিত ছিল, কিন্তু পারে নাই।’
এই মন্তব্যে দলের ব্যাটিং নিয়ে অসন্তোষের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তবে আশরাফুলকে সরানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে এই ম্যাচের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
পরিসংখ্যানেও ফুটে উঠেছে ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা
আশরাফুল দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে ২০০ রানের বেশি লক্ষ্য তাড়া করে জয়ের দেখা পায়নি দলটি।
এ ছাড়া অন্তত ৯০ রানের ব্যবধানে দুইবার হেরেছে বাংলাদেশ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ১৪১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়েও হারের মুখে পড়তে হয়েছে দলকে।
বড় লক্ষ্য তাড়া করতে না পারা, নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারানো এবং ইনিংসের শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হওয়া—এসব বিষয় ব্যাটিং ইউনিটের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ের ফলাফল দিয়ে ব্যাটিং কোচের অবদান পুরোপুরি মূল্যায়ন করা যায় না। দলের পারফরম্যান্সে প্রতিপক্ষের শক্তি, উইকেটের ধরন, খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত ফর্ম এবং ম্যাচ পরিস্থিতির মতো বিষয়ও প্রভাব ফেলে।
আশরাফুলের ক্রিকেট ক্যারিয়ার ও কোচিংয়ে যাত্রা
বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসে মোহাম্মদ আশরাফুল একটি পরিচিত নাম। মাত্র ২০ বছর বয়সে ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।
ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের হয়ে ১৭৭ ম্যাচ খেলে ৩ হাজার ৪৬৮ রান করেছেন আশরাফুল। দেশের হয়ে ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকদের তালিকায় তাঁর অবস্থান পঞ্চম বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেটেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অর্জন। তিনি খেলেছেন ৬১টি টেস্ট। একসময় টেস্টে সেঞ্চুরি করা সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটারও ছিলেন আশরাফুল। এ ছাড়া বাংলাদেশের হয়ে ২৩টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন তিনি।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিং পেশায় যুক্ত হন আশরাফুল। ঘরোয়া ক্রিকেটে কাজ করার অভিজ্ঞতার পর জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচের দায়িত্ব পান তিনি। তবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় এক বছরের মাথায় সেই পদ থেকে সরে যেতে হলো তাঁকে।
বিশ্বকাপের আগে বাংলাদেশের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সময় ঘনিয়ে আসায় বাংলাদেশের ব্যাটিং বিভাগকে দ্রুত গুছিয়ে নেওয়া জরুরি। বড় লক্ষ্য তাড়া করার সামর্থ্য, ব্যাটিংয়ে ধারাবাহিকতা এবং চাপের মুহূর্তে উইকেট ধরে রাখার দক্ষতা বাড়ানো দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সালাহউদ্দিনের দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাটিং ইউনিটে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা এখন দেখার বিষয়। তাঁর আগের জাতীয় দলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ব্যাটারদের আত্মবিশ্বাস ও পারফরম্যান্সে উন্নতি ঘটাতে পারেন কি না, সেটিও নজরে থাকবে।
তবে কোচ পরিবর্তন করলেই যে দলের ফলাফল দ্রুত বদলে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স, দলীয় পরিকল্পনা এবং কোচিং কৌশলের সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিশ্বকাপ প্রস্তুতির সাফল্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আশরাফুলকে সরানোর বিষয়ে বিসিবি নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা না দেওয়ায় সিদ্ধান্তটির আনুষ্ঠানিক কারণ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে সাম্প্রতিক ওয়ানডেতে ব্যাটিং ব্যর্থতা এবং বিশ্বকাপের আগে দলের পারফরম্যান্স উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা এই পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আলোচনায় এসেছে।









