রাতের শেষ প্রহরে ঘুম থেকে উঠে তাহাজ্জুদ আদায় করা মহান আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের বিশেষ আমল। তবে চাকরি, সংসার, শারীরিক ক্লান্তি কিংবা ঘুমের কারণে সবার পক্ষে নিয়মিত রাতে ওঠা সম্ভব হয় না। তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে না পারলেও নফল ইবাদতের বিভিন্ন সুযোগ রয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন, এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত।’ (সুরা বনি ইসরাইল: ৭৯)
তাহাজ্জুদ ফরজ নয়। তাই কোনো কারণে তা আদায় করতে না পারলে গুনাহ হয় না। তবে এর ফজিলত লাভের আকাঙ্ক্ষা থাকলে সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা উচিত।
ঘুমানোর আগে দুই রাকাত নফল
রাতে জাগা কঠিন হলে এশার নামাজের পর বিতিরের আগে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে নেওয়া যেতে পারে। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (স.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাত জাগরণ কষ্টকর হলে বিতিরের পর দুই রাকাত নামাজ পড়ার সুযোগ রয়েছে। পরে শেষ রাতে উঠতে পারলে ভালো, অন্যথায় এই দুই রাকাত কিয়ামুল লাইলের ফজিলত লাভের উপায় হতে পারে। (সুনানে দারেমি: ১৬৩৫; সহিহ ইবনে খুজাইমা: ১১০৬)
শেষ রাতে ওঠা কঠিন হলেও ঘুমানোর আগে এই নফল নামাজ আদায় করা যায়। কেউ চাইলে এর চেয়ে বেশি নফলও পড়তে পারেন।
জাওয়ালের সময় চার রাকাত
দিনের বেলাতেও বিশেষ ফজিলতের নফল নামাজ রয়েছে। জাওয়াল হলো সূর্য মধ্যাকাশ থেকে পশ্চিম দিকে ঢলে পড়ার সময়। এ সময় জোহরের আগে চার রাকাত নামাজ আদায়ের কথা হাদিসে এসেছে।
আব্দুল্লাহ ইবনুস সাইব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) সূর্য ঢলে পড়ার পর জোহরের আগে চার রাকাত নামাজ আদায় করতেন। তিনি বলেছেন, এটি এমন সময়, যখন আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। (জামে তিরমিজি: ৪৭৮)
ফিকহি আলোচনায় এই চার রাকাতকে জোহরের আগের চার রাকাত সুন্নতের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে। তাই যারা জোহরের আগে চার রাকাত সুন্নত আদায় করেন, তারা এই ফজিলতেরও আশা করতে পারেন। তবে এটিকে তাহাজ্জুদের বিকল্প বা সমতুল্য নামাজ হিসেবে হাদিসে উল্লেখ করা হয়নি।
রাতের আমল ছুটে গেলে দিনে আদায়
কারও নিয়মিত রাতের নফল আমল ঘুমের কারণে ছুটে গেলে তা দিনে আদায় করার সুযোগ রয়েছে। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) কোনো কারণে রাতের আমল আদায় করতে না পারলে দিনের বেলায় তা আদায় করতেন।
সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, রাতে নিয়মিত করা আমল ঘুমের কারণে ছুটে গেলে ফজর ও জোহরের মধ্যবর্তী সময়ে তা আদায় করলে রাতের আমলের সওয়াব লেখা হয়। (সহিহ মুসলিম: ১৬৩০)
তাই কোনো রাতে ঘুমিয়ে পড়ার কারণে নিয়মিত নফল আমল ছুটে গেলে সুযোগমতো তা দিনে আদায় করা যেতে পারে।
ইশরাক ও চাশতের নামাজ
রাতে ওঠা সম্ভব না হলেও দিনের শুরুতে নফল নামাজের সুযোগ রয়েছে। ফজরের পর সূর্যোদয় পর্যন্ত জিকিরে থেকে সূর্য ওঠার কিছুক্ষণ পর দুই রাকাত নামাজ আদায় করাকে ইশরাক বলা হয়। দিনের কিছুটা সময় পরে আদায় করা নফল নামাজকে চাশত বা দুহা বলা হয়।
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের নামাজ জামাতে আদায় করে, এরপর সূর্যোদয় পর্যন্ত আল্লাহর জিকিরে থাকে এবং পরে দুই রাকাত নামাজ পড়ে, তার জন্য পূর্ণ হজ ও ওমরার সওয়াব রয়েছে। (জামে তিরমিজি: ৫৮৬)
রাতে উঠতে না পারলে বিতির আগে পড়ুন
রাতে ওঠার ব্যাপারে অনিশ্চিত হলে ঘুমানোর আগে বিতির আদায় করে নেওয়া সুন্নাহসম্মত। রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যে ব্যক্তি আশঙ্কা করে যে সে রাতের শেষভাগে উঠতে পারবে না, সে যেন রাতের শুরুতেই বিতির পড়ে নেয়। (সহিহ মুসলিম: ৭৫৫)
পরে ঘুম ভেঙে গেলে তাহাজ্জুদ পড়া যাবে। তবে পুনরায় বিতর পড়তে হবে না।
অল্প হলেও নিয়মিত আমল
নবী (স.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহর কাছে সর্বাধিক প্রিয় আমল কী? তিনি বলেন, যে আমল নিয়মিত করা হয়, যদিও তা অল্প হয়। (সহিহ বুখারি: ৬৪৬৫; সহিহ মুসলিম: ৭৮৩)
তাই তাহাজ্জুদের জন্য রাতে উঠতে না পারলেও নফল ইবাদতের সুযোগ শেষ হয়ে যায় না। রাতে দুই রাকাত নফল, জাওয়ালের সময়ের আমল, ইশরাক বা চাশতের নামাজ এবং নিয়মিত রাতের আমল ছুটে গেলে তা দিনে আদায় করার সুযোগ রয়েছে।
তাহাজ্জুদের সরাসরি বিকল্প কোনো নামাজ নেই। তবে রাতে উঠতে না পারলেও আল্লাহর ইবাদতের সুযোগ রয়েছে। তাই সাধ্য অনুযায়ী অল্প হলেও নিয়মিত আমল করা এবং সুযোগ পেলে তাহাজ্জুদের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই উত্তম।



