সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের কাছে নির্বাচনে পরাজয় স্বীকার করেছেন দীর্ঘদিন ধরে দেশটির রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী আলেকসান্দার ভুসিচ। রোববার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত আগাম সংসদ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে শিক্ষার্থীদের সমর্থিত জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ফলাফল বলকান অঞ্চলের দেশটিতে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক হিসাবের ভিত্তিতে ২৫০ আসনের সংসদে শিক্ষার্থী-সমর্থিত ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে ভুসিচের রাজনৈতিক শিবিরের আসনসংখ্যা প্রায় ১০৫ হতে পারে। তবে নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল তখনো প্রকাশিত হয়নি। \<Cite refs={[“turn714198news10″,”turn714198search1”]}/>
## টেলিভিশনে পরাজয় স্বীকার ভুসিচের
রোববার রাতে টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে ভুসিচ বলেন, নির্বাচনে তাদের পরাজয় স্পষ্ট এবং শিক্ষার্থীদের তালিকা জয়ী হয়েছে। তার এই ঘোষণার পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন এলাকায় সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে।
বেলগ্রেডের রাজপথে জড়ো হন হাজারো মানুষ। গাড়ির হর্ন, নাচ-গান ও বিজয়ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে শহর। শিক্ষার্থী আন্দোলনের সমর্থকেরা ফলাফলকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে জনগণের বিজয় হিসেবে দেখছেন।
বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রাদোমির সাইচিচ শিক্ষার্থীদের নির্বাচনি কার্যালয়ে বলেন, জনগণের কণ্ঠস্বর শোনা যাচ্ছে। তার ভাষায়, এখন বিজয় উদযাপনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ গড়ার কাজ শুরু করতে হবে।
## রেলস্টেশনে প্রাণহানির পর আন্দোলনের সূচনা
সার্বিয়ায় শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয় ২০২৪ সালে নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হওয়ার পর। ঘটনাটি ঘিরে দুর্নীতি, নির্মাণকাজের মান এবং সরকারি জবাবদিহি নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারীরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানান। সময়ের সঙ্গে আন্দোলনটি শুধু শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমর্থনও পেতে শুরু করে।
প্রায় দুই বছর ধরে চলা এই আন্দোলন ভুসিচের রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বরে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়। \<Cite refs={[“turn714198news10″,”turn714198search8”]}/>
## সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পথে শিক্ষার্থী-সমর্থিত জোট
প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের সমর্থিত জোট সংসদের ২৫০টি আসনের মধ্যে ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে ভুসিচের নেতৃত্বাধীন সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) ও তার রাজনৈতিক শিবিরের আসনসংখ্যা প্রায় ১০৫ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এই হিসাব চূড়ান্ত হলে শিক্ষার্থী-সমর্থিত জোট সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তবে নতুন সরকারের গঠন, নেতৃত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব কারা পাবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
জোটটির প্রার্থী তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কৃষক, অভিনেতা ও বিভিন্ন পেশার মানুষ রয়েছেন। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ইলিয়া সারদানোভিচ তালিকাটির নেতৃত্বে থাকলেও তিনিই প্রধানমন্ত্রী হবেন কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
## ভোটার উপস্থিতিতে নতুন রেকর্ডের ইঙ্গিত
নির্বাচনের দিন সার্বিয়ার বিভিন্ন শহর ও জনপদের ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। রাজধানী বেলগ্রেডে ভোট দিতে গিয়ে ভুসিচকেও প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, ভোটার উপস্থিতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছায়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯২ সালে যুগোস্লাভিয়া ভেঙে যাওয়ার পর এটি দেশটির সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির পর্যায়ে রয়েছে বলে জানানো হয়েছে। \<Cite refs={[“turn714198search1″,”turn714198search5”]}/>
উচ্চ ভোটার উপস্থিতিকে রাজনৈতিক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ভোটার উপস্থিতির পাশাপাশি নির্বাচন পরিচালনা ও অনিয়মের অভিযোগও আলোচনায় এসেছে।
## ভুসিচের শাসন নিয়ে অভিযোগ ও বিতর্ক
ভুসিচ ২০১৪ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রী অথবা প্রেসিডেন্ট হিসেবে সার্বিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তার সমর্থকদের মতে, তার নেতৃত্বে দেশটির অর্থনীতির আধুনিকায়ন হয়েছে এবং মহাসড়ক, রেলপথ, স্কুল ও হাসপাতাল নির্মাণে অগ্রগতি এসেছে।
অন্যদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি ও আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, তার শাসনামলে দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন ও আন্দোলনকর্মীদের কেউ কেউ বিক্ষোভ দমনের অভিযোগও তুলেছেন।
তবে ভুসিচ ও তার দল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে বিদেশি শক্তি অর্থায়ন করছে বলেও ভুসিচ দাবি করেছিলেন। শিক্ষার্থীরা সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।
## নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনে জয় পেলেও শিক্ষার্থী-সমর্থিত জোটের সামনে এখন কঠিন দায়িত্ব অপেক্ষা করছে। দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন তাদের ঘোষিত অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশ, নিরাপত্তা সংস্থা ও বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার প্রশ্নও সামনে আসতে পারে। তবে এসব উদ্যোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নতুন সরকারের নীতি ও সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলন থেকে সরকার পরিচালনায় যাওয়ার পথ সহজ হবে না। বিভিন্ন পেশার মানুষের সমন্বয়ে গঠিত জোটকে নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে।
## চীন, রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক
সার্বিয়ার নতুন নেতৃত্বের জন্য পররাষ্ট্রনীতিও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হবে। চীন দেশটির অন্যতম বড় বিনিয়োগকারী, আর রাশিয়া ঐতিহ্যগত মিত্র ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান সরবরাহকারীদের একটি। অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সার্বিয়ার সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
তাই নতুন সরকারকে একদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক ও সদস্যপদ অর্জনের অগ্রগতি এগিয়ে নিতে হবে, অন্যদিকে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে বিদ্যমান সম্পর্কও সামলাতে হবে।
ওয়ারশভিত্তিক নির্বাচন পরামর্শক রাদিভোয়ে গ্রুইচের মতে, নতুন সরকারের নেতৃত্ব, গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীদের পরিচয় এবং দুর্নীতি দমন ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তাদের পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তার বিষয়।
## সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের নির্বাচনি সাফল্য সার্বিয়ার রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। প্রায় দুই বছর ধরে রাস্তায় চলা প্রতিবাদ এবার ভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
তবে প্রাথমিক ফলাফলই এখন পর্যন্ত নির্বাচনের চিত্র তুলে ধরছে। চূড়ান্ত ফল প্রকাশ, নতুন সরকার গঠন এবং ঘোষিত সংস্কার বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই বোঝা যাবে এই পরিবর্তন কতটা স্থায়ী হয়।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবের পর ভুসিচের পরাজয় স্বীকার সার্বিয়ার ক্ষমতার সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শিক্ষার্থী-সমর্থিত জোট জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করে কতটা কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক সরকার গঠন করতে পারে।
**সূত্র:** রয়টার্স ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন।









