ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে সমাজে এখনো বেশ কিছু প্রচলিত ভুল ধারণা রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, শুধু ধূমপায়ীদেরই ফুসফুসের ক্যানসার হয় অথবা রোগটি ধরা পড়লেই আর বাঁচার কোনো সুযোগ নেই।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবতা এতটা সরল নয়। ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি, প্রতিরোধ, চিকিৎসা ও স্ক্রিনিং নিয়ে প্রচলিত কয়েকটি ধারণা আসলে বিভ্রান্তিকর।
নিউইয়র্কের মাউন্ট সিনাইয়ের টিশ ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের থোরাসিক অনকোলজি সেন্টারের বিশেষজ্ঞ ডা. ফ্রেড আর. হার্শ ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে এমন ৯টি ভুল ধারণার বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
১. শুধু ধূমপায়ীদেরই ফুসফুসের ক্যানসার হয়
এটি ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর একটি।
ধূমপান না করলেও একজন মানুষের ফুসফুসের ক্যানসার হতে পারে। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ফুসফুসের ক্যানসারে আক্রান্তদের প্রায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ কখনো ধূমপান করেননি অথবা সারা জীবনে ১০০টিরও কম সিগারেট পান করেছেন।
পরোক্ষ ধূমপান এবং রেডন গ্যাসের সংস্পর্শও ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
২. ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর কোনো উপায় নেই
এ ধারণাটিও সঠিক নয়।
ধূমপান না করা এবং ধূমপায়ী হলে তা ছেড়ে দেওয়া ঝুঁকি কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায়। বাড়ি বা কর্মস্থলে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলাও গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চ ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লো-ডোজ সিটি স্ক্যানের মাধ্যমে স্ক্রিনিং ফুসফুসের ক্যানসারে মৃত্যুর হার কমাতে সহায়তা করতে পারে।
এ ছাড়া রেডন গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করা, নিয়মিত ব্যায়াম এবং ওজন নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
৩. শুধু বয়স্কদেরই এই ক্যানসার হয়
ফুসফুসের ক্যানসার শুধু বয়স্কদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
যদিও আক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি, তবুও কম বয়সিদের মধ্যেও এ রোগ দেখা দিতে পারে। এমনকি ৫০ বছরের কম বয়সিদের মধ্যেও ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত হতে পারে।
তাই বয়স কম হলেই ঝুঁকি একেবারে নেই, এমন ধারণা ঠিক নয়।
৪. দূষিত শহরে থাকা ধূমপানের চেয়েও বেশি বিপজ্জনক
বায়ুদূষণ ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড, সালফার ডাই-অক্সাইড এবং সূক্ষ্ম বস্তুকণার সংস্পর্শের বিষয়টি বিভিন্ন গবেষণায় আলোচিত হয়েছে।
তবে দূষিত শহরে বসবাসের ঝুঁকিকে সরাসরি ধূমপানের ঝুঁকির চেয়ে বেশি বলা যায় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, দুটি ঝুঁকির কারণ একসঙ্গে থাকলে সামগ্রিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
৫. বহু বছর ধূমপানের পর ছাড়লেও কোনো লাভ নেই
অনেকেই মনে করেন, দীর্ঘদিন ধূমপান করার পর ছেড়ে দিয়ে আর কোনো উপকার পাওয়া যায় না।
এ ধারণা ভুল।
ধূমপান যেকোনো বয়সে ছেড়ে দিলে স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া যায়। ধূমপান বন্ধ করলে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি কমার পাশাপাশি হৃদরোগসহ অন্যান্য স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও কমতে পারে।
শ্বাস-প্রশ্বাস ও শারীরিক সক্ষমতারও উন্নতি হতে পারে।
৬. গাঁজা সেবনে ফুসফুসের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে না
গাঁজা ও ফুসফুসের ক্যানসারের সম্পর্ক নিয়ে এখনো দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা গাঁজাকে সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন। এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে একটি সমস্যা হলো, গাঁজা ব্যবহারকারীদের অনেকেই তামাকও ব্যবহার করেন। ফলে কোনটির প্রভাব কতটা, তা আলাদা করা কঠিন।
৭. ক্যানসার ধরা পড়ার পর ধূমপান ছেড়ে লাভ নেই
ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত হওয়ার পরও ধূমপান বন্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগ শনাক্ত হওয়ার পর ধূমপান ছাড়লে চিকিৎসার ফলাফল ও রোগমুক্তির সম্ভাবনার ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
তাই ক্যানসার ধরা পড়ার পর ধূমপান ছাড়ার কোনো মূল্য নেই, এমন ধারণা ঠিক নয়।
৮. অস্ত্রোপচার করলে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে
এটিও প্রচলিত একটি ভুল ধারণা।
বিশেষজ্ঞের বক্তব্য অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারের কারণে ফুসফুসের ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ে না। প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়া কিছু ফুসফুসের ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার চিকিৎসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।
বড় টিউমার বা স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়া রোগের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের আগে কেমোথেরাপি বা ইমিউনোথেরাপি ব্যবহারের কথাও চিকিৎসায় বিবেচনা করা হতে পারে।
৯. ট্যালকম পাউডার শ্বাসের সঙ্গে গেলে ফুসফুসের ক্যানসার হয়
ট্যালকের সংস্পর্শ এবং ফুসফুসের ক্যানসারের মধ্যে প্রমাণিত সরাসরি সম্পর্ক নেই বলে উল্লেখ করেছেন ডা. হার্শ।
এই ধারণার পেছনে ট্যালক খনি ও উৎপাদন কারখানার কর্মীদের নিয়ে করা কিছু গবেষণার বিষয় থাকতে পারে। তবে সেখানে ঝুঁকির কারণ হিসেবে ট্যালক নিজে দায়ী ছিল, নাকি রেডনের মতো অন্য কোনো উপাদান, তা স্পষ্ট ছিল না।
সতর্ক থাকা কেন জরুরি?
ফুসফুসের ক্যানসার নিয়ে ভুল ধারণা অনেক সময় মানুষকে ঝুঁকি উপেক্ষা করতে কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেরি করতে পারে।
তাই ধূমপান এড়িয়ে চলা, পরোক্ষ ধূমপান থেকে দূরে থাকা এবং উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্ক্রিনিংয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ফুসফুসের ক্যানসার শুধু ধূমপায়ীদের রোগ নয় এবং এই রোগ ধরা পড়া মানেই নিশ্চিত মৃত্যু নয়। রোগটি কখন শনাক্ত হচ্ছে এবং কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, তার ওপর ফলাফল অনেকটাই নির্ভর করতে পারে।
মূল কথা
ফুসফুস ক্যানসার নিয়ে প্রচলিত ৯টি ভুল ধারণার মধ্যে রয়েছে শুধু ধূমপায়ীদের এ রোগ হওয়া, কম বয়সিদের ঝুঁকি না থাকা, ধূমপান ছাড়লে কোনো লাভ না হওয়া এবং অস্ত্রোপচারে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়ার ধারণা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ধারণার অনেকগুলোই সঠিক নয়। ঝুঁকি কমাতে ধূমপান বর্জন, পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলা এবং উচ্চ ঝুঁকিতে যথাযথ স্ক্রিনিং গুরুত্বপূর্ণ।









