GULF BANGLA বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন +880 1755727432
Home / আন্তর্জাতিক / ৭৮ বছরে এমন ঘটনা দেখেনি ইসরাইল, নেপথ্যে ভয়ংকর শৈবাল

৭৮ বছরে এমন ঘটনা দেখেনি ইসরাইল, নেপথ্যে ভয়ংকর শৈবাল

৭৮ বছরে এমন ঘটনা দেখেনি ইসরাইল, নেপথ্যে ভয়ংকর শৈবাল

৭৮ বছরে এমন সংকটের মুখে পড়েনি ইসরাইল। সমুদ্রের পানিকে সুপেয় পানিতে রূপান্তর করা দেশটির ছয়টি উপকূলীয় ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের মধ্যে পাঁচটিই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে দেশটিতে পানি সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।

ইসরাইলের জাতীয় পানি কোম্পানি মেকোরোত জানিয়েছে, ভূমধ্যসাগরে মাইলের পর মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এক ধরনের ক্ষুদ্র শৈবাল বা মাইক্রোঅ্যালজি এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ।

সপ্তাহান্তে ইসরাইলের উপকূলজুড়ে অস্বাভাবিকভাবে বড় আকারের শৈবাল বিস্তার দেখা যায়। বেন-গুরিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এদো বার-জিভ ও অন্য গবেষকরা বিষয়টি পরীক্ষা করে মাইক্রোঅ্যালজির উপস্থিতি শনাক্ত করেন।

বার-জিভের হিসাব অনুযায়ী, শৈবালটি অন্তত ১২ মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, এর উৎপত্তি নীল নদের ব-দ্বীপ এলাকায়। পরে সমুদ্রের স্রোতের সঙ্গে এটি উত্তর দিকে ইসরাইলের উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছে।

তিনি জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে উপকূলের পানি পরীক্ষা করলেও এত বড় পরিসরে এমন ঘটনা আগে দেখেননি।

ইসরাইল সুপেয় পানির জন্য ডিস্যালিনেশন প্রযুক্তির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। শুষ্ক এই দেশে বড় কোনো নদী নেই এবং পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতও হয় না। ফলে সমুদ্রের পানি পরিশোধনের প্রযুক্তিতে দক্ষতার কারণে দেশটি পানি ব্যবস্থাপনায় বিশেষ অবস্থান তৈরি করেছে।

বর্তমানে দেশটির অন্তত ৬৫ শতাংশ সুপেয় পানি ডিস্যালিনেশন থেকে আসে। বেশিরভাগ প্ল্যান্টই ভূমধ্যসাগরের উপকূলে অবস্থিত।

এসব প্ল্যান্টে প্রধানত ‘রিভার্স অসমোসিস’ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। প্রথমে সমুদ্রের পানি থেকে বড় দূষণকারী উপাদান সরানো হয়। এরপর বিশেষ পর্দার মধ্য দিয়ে চাপ প্রয়োগ করে পানি পাঠানো হয়। এসব পর্দা লবণ, ব্যাকটেরিয়া ও অন্যান্য কণা আটকে দিয়ে সুপেয় পানি তৈরি করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত শৈবাল ও এর তৈরি বিভিন্ন উপাদান এসব পর্দায় ক্ষতি করতে পারে। পানিতে ভাসমান উপাদানের পরিমাণ বেশি হলে শোধন প্রক্রিয়াও তা সামলাতে হিমশিম খায়।

উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, শৈবাল ও এর তৈরি উপাদান ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টের পর্দাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এ ধরনের ঘটনা একেবারে নতুন নয়। ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ওমান উপসাগরে বড় ধরনের ক্ষতিকর শৈবাল বিস্তারের কারণে ওই অঞ্চলের বেশ কয়েকটি ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।

ইসরাইলে এবার একাধিক প্ল্যান্ট একসঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে বিকল্প পানির উৎস ব্যবহার করছে কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে গ্যালিলি সাগর থেকে পানি সংগ্রহ, ভূগর্ভস্থ কূপ চালু করা এবং জাতীয় পানি মজুত ব্যবহার

কিছু এলাকায় স্বল্পমেয়াদি বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাগানে সেচ দেওয়া এবং সুইমিং পুলে পানি ভরার মতো কাজ রয়েছে।

তবে মেকোরোতের মুখপাত্র লিয়র গুতমান জানান, সংকটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে এমন কৃষকদের ওপর, যারা সেচের জন্য খাবার পানির মানের পানি ব্যবহার করেন। পুনর্ব্যবহৃত পানি ব্যবহারকারী কৃষকদের ওপর এর প্রভাব তুলনামূলক কম।

সময়ের কারণেও সংকট আরও জটিল হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে গ্রীষ্মকালে, যখন ইসরাইলে পানির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পানিতে পুষ্টি উপাদান, তাপমাত্রা, আলো, সমুদ্রস্রোত ও পানির মিশ্রণের মতো বিভিন্ন পরিবেশগত উপাদানের নির্দিষ্ট সমন্বয় ঘটলেই এমন শৈবাল বিস্তার হতে পারে।

মেকোরোতের মতে, সাম্প্রতিক শৈবাল বিস্তারের পেছনে ছিল ‘অত্যন্ত অস্বাভাবিক কিছু উপাদানের মিশ্রণ’। এর মধ্যে একটি সমুদ্রঝড় পানির ঘোলাত্ব বাড়িয়ে দেয় এবং সমুদ্রের তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হয়ে যায়।

গবেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটতে পারে। পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের তাপমাত্রা, স্রোতের গতিপথ ও ঝড়ের ধরনেও পরিবর্তন আসছে। একই সঙ্গে পয়ঃবর্জ্য ও সারসহ বিভিন্ন দূষণকারী উপাদান সমুদ্রে মিশে বড় আকারের শৈবাল বিস্তারের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।

এই ঘটনা ইসরাইলের পানি নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। তীব্র তাপ ও খরার কারণে বিশ্বজুড়ে ডিস্যালিনেশন প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। কিন্তু একটি কেন্দ্রীভূত প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকিও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রাকৃতিক বা জলবায়ুজনিত ঘটনার পাশাপাশি সামরিক হামলা, সাইবার হামলা কিংবা তেল ছড়িয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ডিস্যালিনেশন ব্যবস্থাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

গবেষক এদো বার-জিভের মতে, ডিস্যালিনেশন স্থাপনার আশপাশে তেল ছড়িয়ে পড়লে বর্তমান শৈবাল সংকটের তুলনায় আরও দীর্ঘ সময়ের জন্য প্ল্যান্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Social Icons